প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অধ্যাদেশ বাতিল ও সংশোধন সংক্রান্ত সরকারের অবস্থান ও ব্যাখ্যায় গুরুতর আইনগত অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মনির।
রাজধানীর মগবাজারে সোমবার বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনটি ডাকা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং চিফ হুইপের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে।
শিশির মনির বলেন, গুম ও মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়ে সরকার যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, সংশ্লিষ্ট আইনের ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগে মৌলিক অসংগতি রয়েছে, যা আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি দাবি করেন, গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের গুমের সংজ্ঞা এক নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সাধারণ কোনো ব্যক্তিগত ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাই দুই আইনের সংজ্ঞাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত আইনের বিষয়ে শিশির মনির বলেন, সরকার যে দাবি করছে সেখানে তদন্ত, সময়সীমা এবং ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত কোনো বিধান নেই—তা সঠিক নয়। আইনের নির্দিষ্ট ধারায় এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
গণভোট অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার নিজেই একে কার্যকর ও বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে এর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে সরকারের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
বিচারকদের শোকজ নোটিশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে আইনের আওতায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সেটি ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। তাই সেই আইনের ভিত্তিতে কোনো শোকজ জারি করা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এ ছাড়া ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি, নতুন ধারা সংযোজনের মাধ্যমে পূর্বের মালিকদের কাছে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনও বক্তব্য রাখেন। তিনি সংসদে অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গঠিত বিশেষ কমিটির কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তোলেন।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে সংসদে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নানা ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে। কিছু অধ্যাদেশ পাস হয়েছে, কিছু সংশোধিত হয়েছে এবং কিছু বাতিল বা উপেক্ষিত থেকেছে—যা প্রক্রিয়াগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয় যথাযথ আলোচনার বাইরে থেকে গেছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।
ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আলোচনা চলাকালে কিছু অধ্যাদেশ বাতিলের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা সংশোধিত আকারে আনা হয়েছে। এতে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, কিছু বিল সংসদ সদস্যদের হাতে খুব স্বল্প সময় আগে পৌঁছায়, ফলে যথাযথ বিশ্লেষণের সুযোগ পাওয়া যায়নি। এতে সংসদীয় আলোচনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
জুলাই জাদুঘর বিল নিয়েও তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, এ বিষয়ে বিরোধী মতামত যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটেছে।
বক্তারা বলেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় মতভিন্নতা উপেক্ষা করা হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ভবিষ্যতে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত বক্তব্যে সরকারের বিভিন্ন অধ্যাদেশ ও আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে তীব্র বিতর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের বিতর্ক ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আলোচনার জন্ম দিতে পারে।