প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের প্রকোপ। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৯ শিশুর মৃত্যুর খবর জনমনে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে একজন শিশু নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, আর বাকি আটজন হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। একদিনে এতসংখ্যক শিশুমৃত্যুর ঘটনা স্বাস্থ্যখাতে নতুন করে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১৩ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১৪ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে। মৃত শিশুদের মধ্যে ছয়জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের, দুজন চট্টগ্রামের এবং একজন রাজশাহী অঞ্চলের বাসিন্দা। অঞ্চলভিত্তিক এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতেই হামের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি তীব্র হয়ে উঠছে।
শুধু মৃত্যুই নয়, আক্রান্তের সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১০৫ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ঢাকা বিভাগের। এছাড়া নতুন করে ৬৯৮ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন। নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ১৭৬ শিশু, যার মধ্যে ১৫৭ জনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই অবহেলা করার মতো নয়। বরং এটি একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকেত, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জটিলতা তৈরি করে।
অন্যদিকে, কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ৯৩৫ শিশু হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ বিভিন্ন বিভাগের শিশু রয়েছে। তবে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা শিশুর সংখ্যা বাড়লেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
গত কয়েক সপ্তাহের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হামের সংক্রমণ ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে মোট ৩১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ১৬৪ শিশু। একই সময়ে ১৮ হাজারের বেশি শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১১ হাজারেরও বেশি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এসব তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে টিকা গ্রহণে অনীহা, তথ্যের অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেক অভিভাবক এখনো শিশুর জ্বর বা র্যাশকে গুরুত্ব না দিয়ে দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, যা পরবর্তীতে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারাদেশে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে ভ্রাম্যমাণ টিকাদান কার্যক্রম ও সচেতনতা কর্মসূচিও জোরদার করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, এ ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সচেতনতা জরুরি।
একজন শিশুর অসুস্থতা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ সংক্রামক রোগ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং একাধিক জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। তাই শিশুদের যেকোনো জ্বর, সর্দি, র্যাশ বা চোখ লাল হওয়া—এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অপুষ্টিতে ভোগা ও টিকা না পাওয়া শিশুরা। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হামের সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। ফলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইতোমধ্যেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তার ওপর হামের মতো সংক্রামক রোগের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার, যাতে করে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সংক্রামক রোগের বিস্তার ঠেকাতে হলে প্রয়োজন দ্রুত শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা এবং সর্বোপরি সচেতনতা। হামের এই বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জও বটে, যা মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।