জ্বরেই সতর্কতা জরুরি, হামে বাড়ছে শিশু ঝুঁকি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫০ বার
শিশুর জ্বর হামের লক্ষণ সচেতনতা

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ, আর শয্যা সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন অভিভাবকরা। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা বারবার সতর্ক করে বলছেন—শিশুর জ্বরকে অবহেলা করা যাবে না, শুরু থেকেই সচেতনতা বাড়াতে হবে।

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের চিত্র এখন প্রায় একই রকম। বিশেষ করে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে দেখা গেছে ভয়াবহ চাপ। সেখানে কোনো সিট খালি নেই, রোগীর সংখ্যা এতটাই বেশি যে বাধ্য হয়ে ওয়ার্ড সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তারপরও অনেক অভিভাবক তাদের অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটছেন, একটি শয্যার আশায়।

এই সংকটময় বাস্তবতার মধ্যেই দেখা যায় ১৪ মাস বয়সী ছোট্ট শিশু রাইয়ানের গল্প। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে হামের সঙ্গে লড়াই করে সে এখন কিছুটা সুস্থতার দিকে। কিন্তু তার চোখেমুখে এখনো ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, শরীরজুড়ে শুকিয়ে যাওয়া ফুসকুড়ির দাগ। তার মা এখনও আতঙ্ক কাটাতে পারছেন না। সন্তানের জ্বর, কাশি ও র‍্যাশ—সব মিলিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটেছে তাদের।

এমন অভিজ্ঞতা এখন অনেক পরিবারের। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ওঠা শিশুর সংখ্যাও কম নয়, কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় থাকা শিশুদের অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা কোনো অংশে কমছে না। অনেকেই দিন-রাত হাসপাতালের করিডোরে কাটাচ্ছেন, শুধু সন্তানের সুস্থতার আশায়।

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বেড়েছে। এক অভিভাবকের অভিযোগ, একটি ওয়ার্ডে যেখানে দেড়শর বেশি শিশু চিকিৎসাধীন, সেখানে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। এতে চিকিৎসা সেবা যথাযথভাবে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্যসেবার এই সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা। ডিএনসিসি হাসপাতালের শিশু বিভাগের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, শিশুর জ্বর শুরু হলেই সচেতন হতে হবে। অনেক সময় অভিভাবকরা জ্বরকে সাধারণ সমস্যা মনে করে অপেক্ষা করেন, কিন্তু এর মধ্যেই রোগ জটিল হয়ে ওঠে। জ্বরের সঙ্গে যদি কাশি, সর্দি বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই পরিবারের বা আশপাশের একাধিক শিশু একসঙ্গে আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ হামের সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই কোনো শিশুর শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে তাকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে যেসব শিশু এখনো টিকার আওতায় আসেনি বা অপুষ্টিতে ভুগছে। তাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় রোগটি দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে। জানা গেছে, চলতি মাসের ২০ তারিখ থেকে সারা দেশে নতুন করে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে, যার মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষিত করার চেষ্টা করা হবে।

তবে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক সময় দেখা যায়, জ্বর বা ফুসকুড়িকে গুরুত্ব না দিয়ে ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি শিশুর জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে হামের এই প্রাদুর্ভাব শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি সামাজিক সচেতনতারও পরীক্ষা। একটি শিশুর অসুস্থতা পুরো পরিবারের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে, আর সংক্রামক রোগ হলে তা দ্রুত সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব শিশুর সামান্য উপসর্গকেও গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো প্রতিরোধ। আর সেই প্রতিরোধের শুরু হয় সচেতনতা থেকে। শিশুর জ্বর, কাশি বা শরীরে র‍্যাশ—এসব লক্ষণকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—সময়মতো সতর্ক না হলে বিপদ আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। তবেই এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত