প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মামলার জট দেশের সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সেই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান যে তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তা একদিকে যেমন উদ্বেগজনক, অন্যদিকে সরকারের চলমান সংস্কার উদ্যোগগুলোর দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি। এই বিপুল সংখ্যক মামলার বোঝা বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও, তা নিরসনে সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ময়মনসিংহ-৬ আসনের বিরোধী দলের সদস্য মো. কামরুল হাসানের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব তথ্য দেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বিচারপ্রার্থী মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং দ্রুত, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী বিচার নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকারমূলক লক্ষ্য। এই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বিভিন্ন কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং আরও বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমাতে বিচারিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে সারা দেশে ৮৭১টি নতুন আদালত সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ২৩২টি নতুন বিচারকের পদ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৩০৪টি বিচারকের পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি জানান, বিচারক সংকট দূর করতে ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রমও এগিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি বিচার বিভাগের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ৭০৮ জন বিচার বিভাগীয় কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে এবং আরও ৫৫৩ জন কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বিচারব্যবস্থার আধুনিকীকরণেও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। আইনমন্ত্রী জানান, ‘দ্য কোড অব সিভিল প্রসিডিউর, ১৯০৮’-এ যুগোপযোগী সংশোধন আনা হয়েছে এবং ‘দ্য কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ ইতোমধ্যে সংসদে পাস হয়েছে। এই সংশোধনের ফলে বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে, সমন জারির ক্ষেত্রে এসএমএস ও ভয়েস কল ব্যবহারের বিধান যুক্ত হওয়ায় সময় ও খরচ উভয়ই কমবে। একই সঙ্গে অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি ও লিখিত জবাব দাখিল এবং সরাসরি জেরা করার বিধান যুক্ত হওয়ায় বিচার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
এছাড়া ডিক্রি জারির জন্য আলাদা মামলা দায়েরের প্রয়োজন না রেখে মূল মামলার মধ্যেই সরাসরি দরখাস্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা মামলার সংখ্যা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন, প্রযুক্তিনির্ভর বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০-এর আওতায় সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়াও আধুনিক করা হয়েছে। এখন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং আসামির স্বীকারোক্তি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য অনলাইনের মাধ্যমে গ্রহণ করা হচ্ছে। এর ফলে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর হওয়ার পাশাপাশি ভৌগোলিক দূরত্বজনিত সমস্যাও অনেকাংশে দূর হচ্ছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। আইনমন্ত্রী জানান, এ ধরনের মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে সলিসিটরের সভাপতিত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করছে।
বিচারপ্রার্থীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার লিগ্যাল এইড কার্যক্রমও সম্প্রসারণ করছে। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, অভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তার জন্য ‘১৬৬৯৯’ হটলাইন চালু করা হয়েছে। এর ফলে নিম্নআয়ের মানুষ সহজেই আইনি সহায়তা পাচ্ছেন এবং আদালতের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমছে।
আইনমন্ত্রী আরও জানান, অধস্তন ও উচ্চ আদালতের কজলিস্ট শতভাগ অনলাইনে আনা হয়েছে। এর ফলে এখন বিচারপ্রার্থীরা ঘরে বসেই মামলার তারিখ ও অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারছেন। এতে বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমেছে। ডিজিটালাইজেশনের এই উদ্যোগ বিচার ব্যবস্থাকে আরও জনগণবান্ধব করে তুলছে।
বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনমন্ত্রী বলেন, আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১০টি জেলার ১০২টি ইউনিয়নে অনলাইনে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন কার্যক্রম শিগগিরই চালু হবে। মুসলিম বিবাহ আইন অনুযায়ী পরিচালিত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জালিয়াতি রোধের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মামলার সংখ্যাও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং জনগণের যেকোনো গঠনমূলক সুপারিশ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গৃহীত পদক্ষেপগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হলে দেশের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং জনগণ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তার মধ্যে মামলার জট অন্যতম প্রধান সমস্যা। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিচারিক কাঠামোর সম্প্রসারণ এবং আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি, আর সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশের বিচার খাত।