প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতির কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু এই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী Sardar Md. Sakhawat Hossain। তার এই মন্তব্য দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
সোমবার নারায়ণগঞ্জের Rupganj-এ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, অতীতে নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। শিশুদের একটি বড় অংশ সেই ঘাটতির কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং অনেকেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি; বরং এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল।
দেশব্যাপী একই দিনে শুরু হওয়া হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিকে এখনই মহামারি বলা যাবে না বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তবুও তিনি সতর্ক করেন যে অবহেলা করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সমালোচনাও করেন। তিনি দাবি করেন, স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়া এবং পরিকল্পনার অভাবই আজকের এই সংকটের অন্যতম কারণ। তার ভাষায়, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মের ফলে স্বাস্থ্যখাত দুর্বল হয়ে পড়েছিল, যার প্রভাব এখন জনস্বাস্থ্যে পড়ছে।
তবে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, সামাজিক কিছু আচরণও এই সমস্যার জন্য দায়ী বলে উল্লেখ করেন তিনি। কিছু মা সন্তানদের নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়াতে অনীহা দেখান বা ব্যস্ততার কারণে তা করতে পারেন না—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং তারা সহজেই হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়।
এদিন থেকে শুরু হওয়া তৃতীয় দফার এই টিকাদান কর্মসূচি আগামী চার সপ্তাহ চলবে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে টিকা প্রদান করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সকল শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগে টিকা নিয়ে থাকলেও একই বয়সসীমার শিশুদের পুনরায় একটি ডোজ দেওয়া হবে, যাতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা Expanded Programme on Immunization (ইপিআই) জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে শুধু বিশেষ ক্যাম্পেইনের টিকাই নয়, নিয়মিত টিকাও প্রদান করা হবে।
হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার এর আগে গত ৫ এপ্রিল প্রথম ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে। ওই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২১ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে ৫ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১৪ লাখ ৮৭ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টিকাদান কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক স্থানে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন, ইবতেদায়ি মাদরাসা, মক্তব এবং এতিমখানায় থাকা শিশুদের সরাসরি টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব শিশু স্কুলে যায় না বা টিকা নিতে পারেনি, তাদের নিজ নিজ এলাকার টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ ও অবহেলিত শিশুদের জন্য অতিরিক্ত টিকাদান কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। বস্তি, বাজার, কারখানা কিংবা পথশিশুদের জন্য এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো শিশুই টিকার বাইরে না থাকে। এমনকি প্রয়োজন অনুযায়ী বিকেল বা রাতেও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে কর্মজীবী মায়েদের সন্তানরাও এই সুবিধা পায়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে টিকার কোনো ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত পরিমাণ ভ্যাকসিন মজুত রয়েছে এবং তা দিয়ে আগামী কয়েক মাস নির্বিঘ্নে টিকাদান কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে। এই আশ্বাস জনমনে কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে এর সফলতা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদানের বিকল্প নেই। সময়মতো টিকা না পেলে শিশুদের মধ্যে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই এই ক্যাম্পেইনকে সফল করতে হলে শুধু সরকারি উদ্যোগই নয়, অভিভাবকদের সচেতন অংশগ্রহণও জরুরি।
সব মিলিয়ে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে যেমন সতর্কবার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও তৈরি করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন—যাতে দেশের প্রতিটি শিশু নিরাপদ থাকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে।