প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরে দখল, দূষণ এবং অবৈধ স্থাপনার কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে নদী দখলদারদের হালনাগাদ পরিসংখ্যান। সরকারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সারাদেশে নদ-নদীর অবৈধ দখলদার হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৯৮২ জন। এই তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে জাতীয় সংসদে, যা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা ও সমালোচনা।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সংসদে জানান, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কর্তৃক দেশের সব নদ-নদীর অবৈধ দখলদারের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। এই হালনাগাদ তালিকায় মোট ২১ হাজার ৯৮২ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যারা দেশের বিভিন্ন নদী, তীরভূমি ও প্লাবনভূমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংসদে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এখন পর্যন্ত হাজার হাজার দখলদারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান কেন পরিচালিত হয়নি। তার প্রশ্নে সরকারের কার্যকারিতা ও বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে এই প্রশ্নোত্তর পর্বে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, নদ-নদীর তীরভূমি, ফোরশোর ও প্লাবনভূমিতে অবৈধ দখল এবং দূষণ রোধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং এটি নদীগুলোর আইনগত অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের একটি রিট পিটিশনের পর উচ্চ আদালত নদ-নদী সংরক্ষণ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন প্রণয়ন এবং ২০১৪ সালে কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে আরেকটি রায়ে দেশের সব নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা নদী রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি তৈরি করে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় পুরনো রেকর্ড অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। সিএস ও আরএস রেকর্ডের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় অনেক স্থানে স্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে, যা উচ্ছেদ কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হলেও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে অন্যতম বড় বাধা হলো মামলা সংক্রান্ত জটিলতা। অনেক নদী দখল মামলায় আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় উচ্ছেদ কার্যক্রম থেমে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কিছু দখলদার আইনি জটিলতার সুযোগ নিচ্ছেন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো স্থানীয় প্রশাসনের সীমিত সক্ষমতা। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত জনবল, লজিস্টিক সহায়তা এবং বাজেট না থাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নদী দখল রোধে প্রশাসনিক কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়েছে।
মন্ত্রী সংসদে আরও জানান, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, নদী দখল ও দূষণকে ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পৃথক নদী আদালত গঠনের কথাও বিবেচনায় রয়েছে, যাতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যায়।
নতুন আইনি কাঠামোতে নদীকে ‘আইনি ব্যক্তি’ বা ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট করা হবে বলে জানা গেছে। এতে নদী দখলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে কমিশনকে তদন্ত, মামলা দায়ের এবং তদারকির ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
সরকার আরও পরিকল্পনা করছে, উচ্ছেদ হওয়া নদী তীরভূমিতে পুনরায় দখল ঠেকাতে স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ এবং সীমানা পিলার স্থাপন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নদী পুনরায় দখলের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হলেও দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক নদী আজ সংকটাপন্ন। নদী শুধু পরিবেশ নয়, কৃষি, অর্থনীতি এবং জীববৈচিত্র্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নদী রক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
পরিবেশবিদদের মতে, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী কয়েক দশকে অনেক নদী মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক ছোট নদী দখল ও ভরাটের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
সব মিলিয়ে ২১ হাজার ৯৮২ জন অবৈধ দখলদারের এই তালিকা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের নদ-নদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, সরকার ঘোষিত নতুন আইন ও উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং নদীগুলোকে আবারও জীবন্ত ও প্রবাহমান অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় কি না।