পৃষ্ঠপোষক অর্থনীতি ভাঙতে সরকারের জোর প্রচেষ্টা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৯ বার

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি বিষয় হলো পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর প্রবণতা, যেখানে সীমিত কিছু গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ ও সুযোগের কেন্দ্রীকরণ ঘটে। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে কাজ করছে বর্তমান সরকার—এমনটাই জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, অতীতের সেই কাঠামো ভেঙে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়, তবে সরকার সে লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছে।

শনিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। আলোচনায় অংশ নেয় Economic Reporters Forum (ইআরএফ)-এর প্রতিনিধিরা, যেখানে আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে নানা প্রস্তাব ও মতামত তুলে ধরা হয়। অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এর ফলে অর্থনীতিতে বৈষম্য বেড়েছে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। তবুও সরকার চেষ্টা করছে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে, যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষক কার্ড উল্লেখযোগ্য।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্যের হার ধীরে ধীরে কমলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক ব্যবসায়ী এখনো কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, আবার ব্যাংকঋণ পরিশোধেও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সরকার এমন নীতি প্রণয়ন করতে চায়, যা একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহায়তা করবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করবে।

আসন্ন জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে তিনি জানান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তার মতে, কেবলমাত্র উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জনই যথেষ্ট নয়, বরং বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে ভোকেশনাল বা কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।

এদিকে অর্থনীতি নিয়ে কিছু প্রচলিত ধারণারও ব্যাখ্যা দেন তিনি। সরকার টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক ঋণ নিচ্ছে—এমন ধারণাকে তিনি ভুল বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেশের আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাস্তবে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা বিশ্বের অনেক দেশেই প্রচলিত।

সরকারি ঋণের সাম্প্রতিক তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। তবে ২২ এপ্রিল তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৭২২ কোটি টাকায়। এই তথ্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কিছুটা ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, Bangladesh Bank-এর গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, National Board of Revenue-এর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। তাদের উপস্থিতি এই বৈঠকের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

ইআরএফ-এর পক্ষ থেকে ২১ দফা বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন সংগঠনের সভাপতি দৌলত আকতার মালা। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কর কাঠামো সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সংগঠনের অন্যান্য নেতারাও এসব প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন এবং বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।

অর্থসচিব তার বক্তব্যে জানান, ভবিষ্যতে পণ্য রপ্তানি না করে প্রণোদনা নেওয়ার সুযোগ আর থাকবে না। এতে করে রপ্তানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া এক্রুয়াল ভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে, যা সম্পন্ন হলে সরকারি ব্যয়ের হিসাব আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হবে। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে কিছুটা সময় লাগবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা এবং কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নথিপত্র হালনাগাদের কাজ চলছে।

সার্বিকভাবে এই প্রাক-বাজেট আলোচনা দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার সরকার করছে, তার বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে—সেটিই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত