প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক অবরোধ পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের তেল বাণিজ্যে অপ্রত্যাশিত চিত্র উঠে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। তবে আন্তর্জাতিক ট্রেড ইন্টেলিজেন্স সংস্থার তথ্য বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার উল্টো, বরং যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় ইরানের তেল রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সংঘাত ও অবরোধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, সামরিক চাপ ও নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করা সম্ভব হবে এবং দেশটিকে আলোচনার টেবিলে আনা যাবে। কিন্তু সর্বশেষ তথ্য সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বেলজিয়াম-ভিত্তিক ট্রেড ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলারের তেল রপ্তানি করতো। কিন্তু চলমান অবরোধ পরিস্থিতিতেও দেশটির তেল আয়ের পরিমাণ আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই সংকট মোকাবিলার জন্য অনেক আগেই কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছিল। বিশেষ করে বিকল্প রপ্তানি চ্যানেল, গোপন বাণিজ্য নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি মজুত পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশটি সম্ভাব্য অবরোধের প্রভাব অনেকাংশে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের কাছে প্রায় ১২৭ মিলিয়ন ব্যারেল ভাসমান তেল মজুত ছিল, যা সংকটকালীন বিকল্প সরবরাহ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল না থেকে বরং ঊর্ধ্বমুখী থাকায় ইরান বাড়তি রাজস্ব অর্জন করছে বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা। গত এক মাসে তেলের দাম একদিনের জন্যও ৯০ ডলারের নিচে নামেনি, বরং অনেক সময় তা ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করেছে। ফলে সরবরাহ সীমিত হলেও উচ্চমূল্যের কারণে ইরানের আয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে। তবে এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তব বাজার বিশ্লেষণের মিল না থাকায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও লাভের হিসাব সবসময় সরলরৈখিক হয় না, বরং এটি বহুমাত্রিক প্রভাবের ফলাফল।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। একদিকে সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কৌশলগত লড়াই—দুইয়ের সংমিশ্রণে হরমুজ প্রণালি এখন বৈশ্বিক শক্তি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও বড় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই সংঘাত নিয়ে চাপ বাড়ছে। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের বেশি বিদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারেন না। ফলে আগামী ১ মে’র মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কংগ্রেসে এই অভিযানের বৈধতা প্রমাণ করতে হবে। এই সময়সীমা ঘিরে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে কূটনৈতিক পর্যায়ে নতুন আলোচনার ইঙ্গিতও মিলছে। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে। ওই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা, যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত করা এবং পারমাণবিক আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই প্রস্তাবটি যদি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ সংকট এখন শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের কৌশল, অন্যদিকে ইরানের অভিযোজন ও বিকল্প ব্যবস্থাপনা—এই দুই বিপরীত অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি বাজার এখন এই সংকটের পরবর্তী ধাপের দিকে তাকিয়ে আছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়—তা নির্ভর করছে কূটনৈতিক আলোচনার সফলতা এবং সামরিক উত্তেজনা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় তার ওপর।