সাগর-রুনি হত্যা তদন্তে টাস্কফোর্সকে সময় বৃদ্ধি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৭ বার
সাগর-রুনি হত্যা তদন্তে টাস্কফোর্সকে সময় বৃদ্ধি

প্রকাশ:  ২৭ এপ্রিল  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে নতুন করে আরও ছয় মাস সময় দিয়েছে হাইকোর্ট। বহু প্রত্যাশিত এই মামলার রহস্য উন্মোচনে গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত এই সময় বৃদ্ধি করেন। ফলে বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া আবারও অনিশ্চিত সময়ের দিকে এগিয়ে গেল।

রোববার বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের জন্য নতুন করে ছয় মাস সময় মঞ্জুর করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়ায় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে, যাতে টাস্কফোর্স পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন দাখিল করতে পারে।

এই মামলাটি দেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা দেশের সাংবাদিক সমাজসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

ঘটনার পর রুনির ভাই নওশের আলম শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। শুরুতে থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও অগ্রগতি না হওয়ায় মামলাটি পরবর্তীতে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এক পর্যায়ে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো সংস্থা এখন পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে জানান, থানা, ডিবি ও র‍্যাব মিলিয়ে মোট ১২ বছর আট মাসেরও বেশি সময় তদন্ত চললেও এখনো পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের এত দীর্ঘ সময়েও বিচারিক অগ্রগতি না হওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তার মতে, তদন্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য হস্তান্তরের ঘাটতি এবং সমন্বয়ের অভাব এই জটিলতার অন্যতম কারণ।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও জানান, তদন্ত চলাকালে এ পর্যন্ত আটজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে সাতজন বর্তমানে কারাগারে এবং একজন জামিনে গিয়ে পলাতক রয়েছেন। তবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত থেকেও স্পষ্ট কোনো মোটিভ বা চূড়ান্ত ক্লু পাওয়া যায়নি। নতুন গঠিত টাস্কফোর্সও এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না কেন এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।

শুনানির সময় রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির ও মনজিল মোরসেদ তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির করার আবেদন জানান, যাতে তদন্তের অগ্রগতি সরাসরি ব্যাখ্যা করা যায়। তবে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, তদন্ত কর্মকর্তা একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন এবং পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও সময় চেয়েছেন।

শুনানির পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, প্রায় ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত বড় একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা কাজ করেও কেন কোনো চূড়ান্ত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, টাস্কফোর্স বলছে তারা এখনও মোটিভ ও ক্লু খুঁজে পায়নি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, টাস্কফোর্স তাদের প্রতিবেদনে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, র‍্যাবের ডিজি এবং একজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এসব ব্যক্তি এখন দেশের বাইরে অবস্থান করায় তদন্ত কতটা কার্যকরভাবে এগোতে পারবে। তার আশঙ্কা, এই তদন্ত যদি ব্যর্থ হয়, তবে ন্যায়বিচারের পথ আরও দীর্ঘায়িত হবে।

অন্যদিকে, মামলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত ১২৫ বারেরও বেশি সময় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বাড়ানো হয়েছে। এটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো সংস্থা এখন পর্যন্ত আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি, যা বিচারপ্রার্থী পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি তদন্ত বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। একটি হত্যা মামলার ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সময় যত গড়ায়, প্রমাণ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়ে। একই সঙ্গে সাক্ষীদের স্মৃতিও দুর্বল হয়ে পড়ে, যা মামলার ফলাফলে প্রভাব ফেলে।

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি গভীর ক্ষত। এই ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায় বলে মনে করছেন অনেকে।

নতুন করে ছয় মাস সময় দেওয়ার পর এখন সবার নজর টাস্কফোর্সের পরবর্তী প্রতিবেদনের দিকে। তারা কি শেষ পর্যন্ত এই দীর্ঘদিনের রহস্য উন্মোচন করতে পারবে, নাকি এই মামলাও আরও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত