প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যশোরের ঐতিহাসিক উলশী খাল পুনঃখনন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বর্ণাঢ্য আয়োজনে। স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে শুরু হওয়া এই খাল পুনঃখনন কার্যক্রম ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সোমবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে কোদাল হাতে মাটি কেটে এই পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ হাজারো স্থানীয় মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সকাল থেকেই অনুষ্ঠানস্থলে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকায় কঠোর নজরদারি বজায় রাখেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, উলশী খাল শুধু একটি জলপথ নয়, এটি যশোর অঞ্চলের ইতিহাস ও কৃষিভিত্তিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন ধরে খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় আশপাশের এলাকায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। ফলে কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খাল পুনঃখননের উদ্যোগ তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের মতো একটি ঘটনা। তারা আশা প্রকাশ করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে এবং কৃষিকাজে নতুন গতি আসবে। অনেকেই বলেন, বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতার কারণে যেসব ভোগান্তি সহ্য করতে হয়েছে, এই উদ্যোগ সেই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর খাল পাড়ে একটি সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তারেক রহমান স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং প্রকল্পটির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং কৃষি ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন। তারা জানান, প্রায় পাঁচ দশক আগে ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর সংযোগস্থলে উলশী-যদুনাথপুর এলাকায় খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই সময়ের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে এই কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে স্বেচ্ছাশ্রমে হাজার হাজার মানুষ এই কাজে অংশ নেন।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। উলশী গ্রামের প্রবীণ আবদুল বারিক মণ্ডল বলেন, সেই সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে করে এসে স্কুল মাঠে অবতরণ করেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে নিজ হাতে খাল খননের কাজ শুরু করেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ বিনা পারিশ্রমিকে এই কাজে অংশ নেয়, যা ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তিনি আরও বলেন, কাজের বিনিময়ে মানুষকে শুধু সাধারণ খাবার দেওয়া হতো, কিন্তু উৎসাহ ছিল অসীম। হাজারো মানুষ স্বেচ্ছায় এই প্রকল্পে যুক্ত হয়ে খাল খনন সম্পন্ন করেন। তার মতে, সেই সময়ের সেই ঐক্য ও উদ্দীপনা আজও মানুষ স্মরণ করে।
বর্তমান পুনঃখনন উদ্যোগকে ঘিরেও স্থানীয়দের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা খালটি পুনরুজ্জীবিত হলে শুধু কৃষি নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
স্থানীয় এক কৃষক বলেন, বর্ষায় জমিতে পানি জমে ফসল নষ্ট হয়ে যেত, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া যেত না। খাল পুনঃখনন হলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, খাল পুনঃখনন প্রকল্পটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং এতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে এটি যশোর অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় একটি বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
এদিকে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে পুরো এলাকায় ছিল উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেন। অনেকেই এটিকে এলাকার উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেছেন, এই উদ্যোগ যেন শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে এই খাল পুনঃখনন প্রকল্প যশোর অঞ্চলের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরে যশোরে আরও কয়েকটি উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। সব মিলিয়ে উলশী খাল পুনঃখননকে কেন্দ্র করে যশোরে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের নতুন আশাবাদ ও প্রত্যাশা।