প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের কোটি কোটি মোবাইল গ্রাহকের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে বড় এক উদ্যোগ নিয়েছে Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission। ঘরের ভেতরে কথা বলতে গিয়ে কল ড্রপ, কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে ধীরগতির সমস্যায় যারা নিয়মিত ভুগছেন, তাদের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে ‘ই-জিএসএম’ ব্যান্ডের তরঙ্গ বরাদ্দের পরিকল্পনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের মান বিশেষ করে ঘরের ভেতরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোবাইল সংযোগধারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি। এই বিশাল সংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যবহারকারী শহরাঞ্চলে বসবাস করলেও বাকি ৬০ শতাংশ রয়েছেন উপশহর ও গ্রামীণ এলাকায়। যদিও শহরে তুলনামূলকভাবে নেটওয়ার্কের মান কিছুটা ভালো, কিন্তু প্রান্তিক এলাকাগুলোতে এখনও নেটওয়ার্ক দুর্বলতা বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঘরের ভেতরে মোবাইল ফোনে কথা বলতে গেলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহারে কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া যায় না।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখে ‘ই-জিএসএম’ ব্যান্ডে তরঙ্গ বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটরগুলোর মধ্যে Robi Axiata Limited এবং Banglalink এই ব্যান্ডে তরঙ্গ বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছে। তারা প্রত্যেকে ৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ করে মোট ৬ দশমিক ৮ মেগাহার্টজ তরঙ্গ চেয়েছে। বর্তমানে বিটিআরসির কাছে মোট ৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ ‘ই-জিএসএম’ তরঙ্গ বরাদ্দযোগ্য রয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে এক মাসের জন্য এই তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হবে, নতুন এই ব্যান্ড ব্যবহার করলে নেটওয়ার্কের মান কতটা উন্নত হয় এবং গ্রাহক পর্যায়ে এর প্রভাব কী হতে পারে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ব্যবহৃত ৮৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত বাধা সৃষ্টি হয় কিনা, সেটিও এই পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ই-জিএসএম’ ব্যান্ড মূলত কম ফ্রিকোয়েন্সির একটি তরঙ্গ, যা সহজেই দেয়াল বা অন্যান্য বাধা অতিক্রম করতে পারে। ফলে এটি ঘরের ভেতরে সিগন্যাল পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এর ফলে যেসব এলাকায় বা যেসব ভবনের ভেতরে নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকে, সেখানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যেতে পারে।
Grameenphone ইতোমধ্যে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে তরঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে কিছুটা নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এখন অন্যান্য অপারেটররাও ‘ই-জিএসএম’ ব্যান্ড ব্যবহার করে নিজেদের সেবা আরও উন্নত করতে চাইছে।
রবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক সময় গ্রাহকরা বাসায় বসে ঠিকমতো ডাটা নেটওয়ার্ক পান না। এই সমস্যাটি সমাধানে ‘ই-জিএসএম’ ব্যান্ড কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের ভাষায়, এই ব্যান্ড ব্যবহারের জন্য তারা প্রযুক্তিগতভাবে প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও তাদের কাছে রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলালিংক জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক বরাদ্দের মাধ্যমে তারা এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করবে। পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে ভবিষ্যতে এই তরঙ্গ কিনে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই উদ্যোগের ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন সাধারণ গ্রাহকরা। বিশেষ করে যারা গ্রামীণ বা দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে এক বড় স্বস্তির খবর। একই সঙ্গে শহরের বহুতল ভবনের ভেতরে যারা নেটওয়ার্ক সমস্যায় ভোগেন, তারাও এর সুফল পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোবাইল নেটওয়ার্ক এখন আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই নেটওয়ার্কের মান উন্নয়ন শুধু গ্রাহক সন্তুষ্টিই বাড়াবে না, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।
তবে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত সেবা নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ‘ই-জিএসএম’ ব্যান্ডে তরঙ্গ বরাদ্দের এই উদ্যোগ দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের নেটওয়ার্ক সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান মিলতে পারে, যা দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।