হামের প্রকোপে বাড়ছে মৃত্যু, উদ্বেগে স্বাস্থ্যখাত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার
হামের প্রকোপে বাড়ছে মৃত্যু, উদ্বেগে স্বাস্থ্যখাত

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে Measles বা হাম রোগের প্রকোপ। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে নতুন করে শঙ্কার মুখে ফেলেছে। একই সময়ে নতুন করে আরও ১ হাজার ৩৫৮ শিশুর মধ্যে এই রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে Directorate General of Health Services।

সোমবার দুপুরে প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত একদিনে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি সিলেট বিভাগে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, বরং এর পেছনের মানবিক ট্র্যাজেডি দেশের প্রতিটি পরিবারকে নাড়া দেওয়ার মতো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে সারাদেশে ৯০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেসব শিশুর মধ্যে উপসর্গ দেখা যাচ্ছে, তাদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মোট ৩৩ হাজার ৩৮৬ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৯৩ জন শিশুর ক্ষেত্রে রোগটি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে।

এই পরিস্থিতি দেশের হাসপাতালগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত দেড় মাসে ২২ হাজার ৪৪২ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। যদিও তাদের মধ্যে ১৯ হাজার ১৮ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে, তবুও প্রতিদিন নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চাপ অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে। সময়মতো টিকা না নেওয়া, পুষ্টিহীনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এই রোগের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী শিশুরা নিয়মিত টিকার আওতায় আসতে পারে না। ফলে তারা সহজেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, এখনও অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত সচেতনতা ও সেবা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

অভিভাবকদের অনেকেই জানিয়েছেন, হঠাৎ করে শিশুদের জ্বর, ফুসকুড়ি এবং দুর্বলতা দেখা দিলে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে হাসপাতালে নেওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

একজন মা বলেন, “আমার সন্তানের হঠাৎ জ্বর এল, পরে শরীরে দাগ উঠতে শুরু করে। আমরা বুঝতে পারিনি এটা হাম। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলেন অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে।” এমন অভিজ্ঞতা এখন অনেক পরিবারের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, হাম শুধু একটি সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ির রোগ নয়। এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি সতর্ক সংকেত। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই রোগ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।

সব মিলিয়ে, হামের এই বাড়তি প্রকোপ দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি অসংখ্য পরিবারের কান্না ও শোকের প্রতিচ্ছবি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত