ঝুঁকিভিত্তিক অডিটে আয়কর রিটার্ন বাছাই শুরু এনবিআরের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৪ বার
ঝুঁকিভিত্তিক অটোমেটেড আয়কর অডিট প্রক্রিয়া শুরু এনবিআর

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবার আয়কর ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় ও ঝুঁকিভিত্তিক অডিট নির্বাচনের নতুন ধাপ চালু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও বিতর্কিত আয়কর রিটার্ন অডিট প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৩-২৪ করবর্ষে দাখিল করা রিটার্ন থেকে মোট ৭২ হাজার ৩৪১টি রিটার্ন অডিটের জন্য বাছাই করা হয়েছে, যা দেশের কর প্রশাসনের ইতিহাসে একটি বড় ধরনের ডিজিটাল রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এনবিআরের ওয়েবসাইটে মঙ্গলবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই পদ্ধতিতে মানবিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে সম্পূর্ণ ঝুঁকিভিত্তিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে রিটার্ন নির্বাচন করা হয়েছে। অর্থাৎ করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, পূর্ববর্তী কর ইতিহাস, কর ফাঁকির সম্ভাবনা এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে সফটওয়্যার-নির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে অডিটের জন্য রিটার্ন নির্বাচন করা হয়েছে।

এর আগে চলতি এপ্রিল মাসেই ভ্যাট রিটার্নের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঝুঁকিভিত্তিক অটোমেটেড সিলেকশন পদ্ধতি চালু করা হয়, যেখানে ৬০০টি ভ্যাট রিটার্ন অডিটের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। এনবিআর বলছে, দুই ক্ষেত্রেই লক্ষ্য এক—প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থায় আস্থা পুনরুদ্ধার।

দেশের কর ব্যবস্থায় আয়কর অডিট বহুদিন ধরেই একটি সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত। অতীতে অভিযোগ ছিল, অডিট নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে হয়রানির অভিযোগও উঠেছে। অনেক করদাতা ও ব্যবসায়ী দাবি করে আসছিলেন যে, নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করলেও তাদের অযথা অডিটের মুখে পড়তে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বারবার অডিটের আওতায় আসে।

এই অভিযোগগুলোর প্রেক্ষাপটে এনবিআরের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান দায়িত্ব নেওয়ার পর অডিট সিলেকশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তখন বলেছিলেন, স্বয়ংক্রিয় ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা চালু না হওয়া পর্যন্ত অডিট নির্বাচন স্থগিত থাকবে। তার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে এখন ঝুঁকিভিত্তিক অটোমেশন চালু করা হলো।

নতুন পদ্ধতিতে দেশের প্রতিটি কর সার্কেলের জন্য সর্বোচ্চ ২০০ এবং সর্বনিম্ন ২০টি রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। যেখানে কর ফাঁকির ঝুঁকি বেশি বলে সিস্টেম চিহ্নিত করেছে, সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি রিটার্ন অডিটের আওতায় আনা হয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি সম্পূর্ণ ডেটা অ্যানালিটিক্সভিত্তিক সিদ্ধান্ত, যেখানে কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব কাজ করেনি।

গত জুলাই মাসে এনবিআর ১৫ হাজার ৪৯৪টি রিটার্ন দৈবচয়ন (র‌্যানডম) পদ্ধতিতে অডিটের জন্য নির্বাচন করেছিল। তবে সেই পদ্ধতিকে ঝুঁকিভিত্তিক না হওয়ায় সেটি কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি বলে মনে করা হচ্ছে। এবার তাই ঝুঁকির ভিত্তিতে আরও কাঠামোবদ্ধ ও বিশ্লেষণনির্ভর সিস্টেম চালু করা হয়েছে।

অডিট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে করদাতাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে আসছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী শ্রেণির মধ্যে ধারণা ছিল, অডিট মানেই হয়রানি বা অতিরিক্ত চাপ। তবে এনবিআর বলছে, অডিটের মূল উদ্দেশ্য হয়রানি নয়, বরং কর ফাঁকি শনাক্ত করে রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা।

কর প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে, অডিট বন্ধ থাকায় সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আহরণে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। কারণ অডিটের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে গোপন আয় ও অবৈধ লেনদেন শনাক্ত হয়, যা রাষ্ট্রীয় আয় বাড়াতে সহায়তা করে। তাই ঝুঁকিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিকে তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখছেন।

তবে নতুন এই ব্যবস্থাকে ঘিরে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। কর আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ণ অটোমেটেড সিস্টেম সবসময় বাস্তব পরিস্থিতির পূর্ণ প্রতিফলন নাও ঘটাতে পারে। তাদের যুক্তি, এমনও হতে পারে যে একজন করদাতার বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকলেও তিনি কৌশলে আয় কম দেখালে সিস্টেমের নির্ধারিত সূচকে সেটি পুরোপুরি ধরা নাও পড়তে পারে।

এর ফলে কর ফাঁকি দেওয়ার কিছু নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। আবার অন্যদিকে, সিস্টেম নির্ভর হওয়ায় ব্যক্তিগত প্রভাব ও দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে বলেও তারা স্বীকার করছেন। ফলে এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হলেও আরও উন্নত ডেটা ইন্টিগ্রেশন প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই উদ্যোগ দেশের কর ব্যবস্থাকে আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে। ভবিষ্যতে ব্যাংকিং তথ্য, সম্পদ বিবরণী, ভ্যাট তথ্য এবং অন্যান্য সরকারি ডাটাবেজ একত্র করে আরও শক্তিশালী অ্যানালিটিক্স সিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সব মিলিয়ে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট নির্বাচন বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এটি একদিকে যেমন স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়াবে, অন্যদিকে করদাতাদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে এনবিআর।

তবে এই ব্যবস্থার প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগ, ডেটার মান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর—এমনটাই মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত