সরকারি ব্যাংক ঋণ ছাড়াল এক লাখ কোটি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৫ বার
সরকারি ব্যাংক ঋণ ছাড়াল এক লাখ কোটি

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ক্রমবর্ধমান চাপের চিত্র আবারও স্পষ্ট হলো সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিসংখ্যানে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। দৈনন্দিন ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে সরকারের ধারদেনার ওপর নির্ভরতা যে আরও বেড়েছে, সাম্প্রতিক তথ্য সেটিই তুলে ধরছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে মোট ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং ব্যয় বৃদ্ধির চাপ মিলিয়ে মার্চ শেষে দেখা যায়, সরকার ইতোমধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে। যদিও কিছু অংশ পরিশোধের পর নিট ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে এটি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে।

এই ঋণের বড় অংশ এসেছে দেশের প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। পরে কিছু পরিশোধের ফলে নিট ঋণ কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের এই ঋণনির্ভরতা নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর চাপ অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। কারণ একদিকে রাজস্ব আহরণে ধীরগতি, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয় মেটাতে ধার নেওয়া ছাড়া বিকল্প কমে এসেছে।

বিশেষ করে চলতি অর্থবছরে দেশের জাতীয় রাজস্ব আহরণকারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রথম ৯ মাসেই প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করছেন। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের ব্যয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং প্রশাসনিক খাতে। বিশেষ করে ঋণের সুদ পরিশোধ এখন বাজেটের অন্যতম বড় চাপের খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের ঋণ নেওয়া কিছুটা অনিবার্য হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থ পায় না, ফলে বিনিয়োগ কমে যায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গিয়ে টাকা ছাপানোর প্রবণতা থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট বাজেট প্রায় আট লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এর বড় অংশ জোগান দেওয়ার কথা রাজস্ব খাত থেকে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, আমদানি-রপ্তানি হ্রাস এবং কর আদায়ে দুর্বলতার কারণে লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শুল্ক ও কর আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকার মাঝেমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি ঋণ সুবিধা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে, যা অর্থনীতিতে “টাকা ছাপানো” হিসেবে পরিচিত। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় দ্রুত সেই ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করেছে, তবুও এর ফলে বাজারে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

অন্যদিকে এপ্রিল মাসে কিছুটা ঋণ কমানোর প্রবণতা দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ কিছুটা হ্রাস পেলেও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ আবার বেড়েছে। এটি নির্দেশ করে যে সরকারের আর্থিক চাপ এখনো পুরোপুরি কমেনি।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই ঋণনির্ভর পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল কর ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করাও জরুরি।

তারা আরও বলছেন, শুধু ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প অর্থায়ন উৎস যেমন সঞ্চয়পত্র, বন্ড এবং বৈদেশিক স্বল্পসুদি ঋণের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে ব্যাংক খাতে চাপ কমবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সরকারের ঋণ বৃদ্ধি এখন অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। স্বল্পমেয়াদে এটি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ সংকোচন এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এখনই যদি কাঠামোগত সংস্কার না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনে এই ঋণের বোঝা আরও বাড়বে এবং তা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত