প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকাকে পরিবেশবান্ধব, পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার ও সিটি করপোরেশনগুলো সমন্বিতভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দ্রুত নগরায়ণ ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রাজধানীকে আধুনিক, বাসযোগ্য এবং টেকসই শহর হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যৌথভাবে নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শহরের বায়ুদূষণ কমানো, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করা।
তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত পাঁচ লাখ গাছ রোপণের একটি বড় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে শহরের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন খালি জায়গা, সড়ক বিভাজন ও পার্কগুলোতে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ আচ্ছাদন বাড়ানো হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ঢাকাকে সম্পূর্ণভাবে “জিরো ওয়েস্ট সিটি” বা শূন্য বর্জ্য নগরীতে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে শহরের উৎপন্ন সব ধরনের বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা করা হবে, যাতে পরিবেশ দূষণ কমে আসে এবং বর্জ্য থেকে সম্পদে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। এতে করে নগরবাসীর জীবনমান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকার পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীতে সবুজায়ন বাড়ানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপের কারণে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত ও বসবাসের অনুপযোগী শহরে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নতুন উদ্যোগকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, তবে এর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে কিছুটা সংশয়ও রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধুমাত্র গাছ লাগানো বা প্রকল্প ঘোষণা করলেই হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ, জনসম্পৃক্ততা এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এসব উদ্যোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
অন্যদিকে নগরবাসীর মধ্যেও এই ঘোষণাকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, রাজধানীকে বাসযোগ্য করতে এ ধরনের উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। আবার অনেকে বলছেন, অতীতে ঘোষিত অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা গেছে, তাই এবার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে তারা সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি রাখছেন।
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শুধু গাছ লাগানো নয়, বরং নগর সবুজায়নের জন্য নতুন পার্ক, খেলার মাঠ এবং জলাধার সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি যানবাহন থেকে নির্গত দূষণ কমাতে পরিবহন ব্যবস্থায়ও ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সবুজায়ন বৃদ্ধি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা গেলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। বিশেষ করে নগরবাসীর অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা শহরকে ক্লিন ও গ্রীন সিটিতে রূপান্তর করতে হলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং মানসিকতা পরিবর্তনও জরুরি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নাগরিক সচেতনতা, পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা একসঙ্গে কাজ করলে তবেই সফলতা আসবে।
সব মিলিয়ে রাজধানীকে পরিবেশবান্ধব নগরীতে রূপান্তরের এই উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, অর্থায়ন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর।
সরকার আশা করছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরের পরিবেশে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে এবং এটি ধীরে ধীরে একটি আধুনিক, সবুজ ও বাসযোগ্য মহানগরীতে পরিণত হবে।