প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে উত্তর কোরিয়ার সেনা অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে অন্তত দুই হাজার ৩০০ উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন। এই তথ্য ঘিরে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলগত অঞ্চল কুর্স্ক পুনরুদ্ধারে রাশিয়াকে সহায়তা করতে উত্তর কোরিয়া বড় পরিসরে সেনা মোতায়েন করে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সূত্রের বরাতে জানানো হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে ইউক্রেনীয় বাহিনী কুর্স্ক অঞ্চলে আকস্মিক অনুপ্রবেশের পর রাশিয়ার অবস্থান শক্ত করতে অন্তত ১১ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা সেখানে পাঠানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সেনা মোতায়েন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আন্তর্জাতিকীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। আগে থেকেই পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে আসছিল যে, রাশিয়া বিভিন্ন দেশ থেকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সহায়তা পাচ্ছে। এবার উত্তর কোরিয়ার সেনা অংশগ্রহণ সেই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া কর্তৃপক্ষ বলছে, উত্তর কোরীয় সেনারা মূলত রাশিয়ার হয়ে সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ নিয়েছে। কুর্স্ক অঞ্চলে চলমান সংঘর্ষে তারা ফ্রন্টলাইনে অবস্থান নেয় এবং রাশিয়ান বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে। তবে এই অভিযানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে উত্তর কোরিয়ার সেনারা, যার ফলে কয়েক হাজার সেনা নিহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন এই সেনাদের মৃত্যুর বিষয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন এবং নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। যদিও উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সেনা মোতায়েন বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি, তবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়া এই সামরিক সহযোগিতার বিনিময়ে রাশিয়া থেকে খাদ্য, জ্বালানি, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং সামরিক প্রযুক্তি লাভ করছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা পিয়ংইয়ংয়ের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারিত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন পিয়ংইয়ংয়ের হোয়াসং জেলায় একটি নতুন জাদুঘর নির্মাণের নির্দেশ দেন, যেখানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত সেনাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। এটিকে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে সেনাদের আত্মত্যাগকে জাতীয় বীরত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের সেনা মোতায়েন আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষ করে কোনো তৃতীয় দেশের যুদ্ধে সরাসরি সেনা পাঠানো বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও দুর্বল করতে পারে বলে সতর্ক করছেন তারা।
ইউক্রেন যুদ্ধ ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এখন উত্তর কোরিয়ার সরাসরি অংশগ্রহণ সেই সংঘাতকে আরও বিস্তৃত আকার দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে চলমান উত্তেজনা এই ঘটনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে দুই দেশই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতি সাধারণ উত্তর কোরীয় নাগরিকদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বিদেশে যুদ্ধ করতে গিয়ে সেনাদের প্রাণহানি দেশের অভ্যন্তরে গোপনীয়তা ও নিয়ন্ত্রণের কারণে খুব কমই প্রকাশ পায়।
এদিকে ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলো এখনো এই প্রতিবেদন সম্পর্কে সরাসরি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে কূটনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ব নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েনের বিষয়টি সত্য হয়, তবে এটি ইউক্রেন যুদ্ধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল করে তুলবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতি এক অস্থির সময় পার করছে। এই অবস্থায় উত্তর কোরিয়ার মতো একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আর কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ধীরে ধীরে বহুপাক্ষিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের সরাসরি বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ নতুন বৈশ্বিক উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।