প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। উত্তর মালুকু প্রদেশের মাউন্ট ডুকোনো আগ্নেয়গিরি থেকে শুক্রবার সকালে হঠাৎ এই অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪১ মিনিটে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয় বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগ্নেয়গিরি থেকে ঘন ছাই ও ধোঁয়া আকাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার উচ্চতায় ছড়িয়ে পড়ে, যা আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতি তৈরি করে।
ইন্দোনেশিয়ার উত্তর হালমাহেরা পুলিশের প্রধান এরলিখসন পাসারিবু নিশ্চিত করেছেন, এই ঘটনায় দুই বিদেশি নাগরিক এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছে। তিনি জানান, আহত হয়েছেন আরও অন্তত পাঁচজন। নিহত দুই বিদেশি সিঙ্গাপুরের নাগরিক বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অগ্ন্যুৎপাতের সময় পাহাড়ি এলাকায় একদল পর্বতারোহী অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ অগ্ন্যুৎপাত শুরু হওয়ায় তারা নিরাপদে সরে যেতে পারেননি এবং অনেকেই আটকা পড়ে যান। এদের মধ্যে অন্তত ২০ জন পর্বতারোহী এখনও নিখোঁজ বা আটকে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারী সংস্থার প্রধান ইওয়ান রামদানি জানিয়েছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও সেনাবাহিনী, স্থানীয় উদ্ধারকারী দল এবং স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আটকে পড়া পর্বতারোহীদের মধ্যে সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকরা রয়েছেন এবং তাদের নিরাপদে উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে।
অগ্ন্যুৎপাতের পর মাউন্ট ডুকোনো এলাকায় সর্বোচ্চ তৃতীয় স্তরের সতর্কতা জারি করেছে ইন্দোনেশিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা। স্থানীয়দের জন্য পর্বতাঞ্চলে যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং আশপাশের গ্রামগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাউন্ট ডুকোনো ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, যা নিয়মিতভাবে অগ্ন্যুৎপাতের ঝুঁকিতে থাকে। তবে সাম্প্রতিক এই অগ্ন্যুৎপাতের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় তা মানবিক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, অগ্ন্যুৎপাতের সময় সৃষ্ট আগ্নেয় ছাই বাতাসের মাধ্যমে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে বিমান চলাচল এবং স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থায়ও বিঘ্ন ঘটে। কয়েকটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নিহত ও আহতদের পরিবারের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সিঙ্গাপুর সরকারও তাদের নাগরিকদের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দোনেশিয়া “প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার”-এ অবস্থিত হওয়ায় সেখানে প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। তবে পর্যটন এলাকায় এমন দুর্ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া ও ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আটকে পড়া পর্বতারোহীদের দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থা এবং পর্যটন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি অঞ্চলে পর্যটকদের প্রবেশে কঠোর নজরদারি জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
এদিকে স্থানীয় জনগণও এই ঘটনার পর আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে সরে গেছে এবং প্রশাসনকে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে মাউন্ট ডুকোনোর এই ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত ইন্দোনেশিয়ার জন্য একটি বড় মানবিক ও প্রাকৃতিক সংকট তৈরি করেছে। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকলেও নিখোঁজদের ভাগ্য নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।