হাম আক্রান্তে একদিনে ৭ শিশুর মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শিশু মৃত্যু

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে হামের প্রকোপ আবারও ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৪৯৪ জন শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সতর্ক সংকেত। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা এবং সময়মতো টিকাদান না হওয়াকে এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে সিলেট বিভাগে। এই বিভাগে তিনজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার ফলে একদিনেই তিনটি পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ঢাকায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি খুলনা ও বরিশাল বিভাগে একজন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, হামের প্রাথমিক উপসর্গগুলো অনেক সময় সাধারণ জ্বর-সর্দি হিসেবে ধরা পড়ে, যার ফলে অনেক অভিভাবক শুরুতে গুরুত্ব দেন না। পরে যখন শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে, তখন হাসপাতালে নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়।

গত কয়েকদিনের পরিসংখ্যান পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। শুধু আগের দিনেই সারা দেশে ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল হামের উপসর্গে। তারও আগে ৪ মে একদিনেই ১৭ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যা সাম্প্রতিক সময়ে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ধারাবাহিক এই মৃত্যুর প্রবণতা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের এই প্রকোপ মূলত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবায় আঞ্চলিক বৈষম্য এবং জনসচেতনতার অভাবের কারণে বাড়ছে। অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পুরোপুরি কার্যকর নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে একাধিক শিশুতে সংক্রমণ ঘটতে পারে যদি তারা টিকা না নেয়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

চিকিৎসকরা আরও জানান, হামের ক্ষেত্রে উচ্চ জ্বর, শরীরে লালচে র‍্যাশ, কাশি, চোখে লালভাব এবং দুর্বলতা সাধারণ লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। তবে সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু রোগীদের চাপ অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে শয্যা সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি রাখতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর চাপও বাড়ছে।

তারা আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে, যেন তারা শিশুদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করেন এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অভিভাবকদের মধ্যে অনেকেই সন্তানের মৃত্যুতে চরম শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, সময়মতো সঠিক তথ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পেলে অনেক শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব ছিল।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো মানুষ হামকে সাধারণ রোগ হিসেবে ধরে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, এই মানসিকতা পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আরও বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনকে জনগণকে সচেতন করতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

হামের এই সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রতিরোধই এই রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সময়মতো টিকা প্রদান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই এই ধরনের মৃত্যুর ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত