খাদিজা ক্লিনিকে প্রসূতির মৃত্যু, ক্ষোভ নড়াইলে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
খাদিজা ক্লিনিকে প্রসূতির মৃত্যু, ক্ষোভ নড়াইলে

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নড়াইলের কালিয়ায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার নামে চলা একটি ক্লিনিককে ঘিরে আবারও উঠেছে ভয়াবহ অবহেলা ও অপচিকিৎসার অভিযোগ। ‘খাদিজা সেবা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এ সিজারিয়ান অপারেশনের পর তাজিন ইসলাম নামের এক তরুণ প্রসূতির মৃত্যু ঘিরে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাত্র ২০ বছর বয়সী এই গৃহবধূর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, বরং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা, অনিয়ম এবং নজরদারির ঘাটতিকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

নিহত তাজিন ইসলাম লোহাগড়া উপজেলার মুচড়া গ্রামের মো. ইয়াছিন মোল্লার স্ত্রী এবং কালিয়া উপজেলার উথলী গ্রামের আইয়ুব শেখের মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, একটি স্বাভাবিক সিজারিয়ান অপারেশনের আশায় তারা স্থানীয় ক্লিনিকে গেলেও শেষ পর্যন্ত ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে প্রাণ হারাতে হয়েছে তাজিনকে।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২ মে দুপুরে প্রসব ব্যথা উঠলে তাজিনকে বাবার বাড়ি থেকে কালিয়া পৌর এলাকার খাদিজা সেবা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে খুলনা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে পরিবারকে আশ্বস্ত করা হয় যে অভিজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে অপারেশন করানো হবে। পরে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। নবজাতক সুস্থ থাকলেও অপারেশনের পর থেকেই ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে তাজিনের।

পরিবারের অভিযোগ, অপারেশনের পরদিনই তাজিনের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে দ্রুত খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেয়। এমনকি যথাযথ ছাড়পত্র বা চিকিৎসার পূর্ণ নথিও পরিবারকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে খুলনার সেই হাসপাতালে সাত দিন চিকিৎসাধীন থাকার পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। তবে অবস্থার অবনতি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানেই গভীর রাতে মৃত্যু হয় তাজিন ইসলামের।

তাজিনের দুলাভাই ইমামুল ইসলাম রিয়ান অভিযোগ করেন, সাইনবোর্ডে বড় চিকিৎসকের নাম দেখে তারা ক্লিনিকটির ওপর আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু অপারেশনের পর কোনো দায়িত্ব না নিয়ে দ্রুত রোগীকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। তিনি দাবি করেন, খুলনার চিকিৎসকরা তাদের জানিয়েছেন যে সিজারিয়ান অপারেশনের সময় তাজিনের উচ্চ রক্তচাপ ছিল এবং তার শরীরে অতিরিক্ত অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ করা হয়েছিল। এর ফলে স্ট্রোক করে মস্তিষ্কের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরিবারের সদস্যরা এই মৃত্যুকে “স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং চিকিৎসাজনিত হত্যাকাণ্ড” বলে উল্লেখ করেছেন। তারা জড়িত চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাজিনের মৃত্যুর খবরে এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরেই ওই ক্লিনিকে অনিয়ম ও অবহেলার ঘটনা ঘটছে, কিন্তু প্রভাবশালী মহলের কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে খাদিজা সেবা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাজনিত জটিলতায় অন্তত ছয়জন প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের আগস্ট মাসেও একই ক্লিনিকে লাবনী আক্তার নামের এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ক্লিনিকটির অপারেশন থিয়েটার সাময়িকভাবে সিলগালা করেছিল। পরে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কিছুদিনের মধ্যেই রহস্যজনকভাবে আবার ক্লিনিকটির কার্যক্রম চালু হয়ে যায়।

এ ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কেন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই অদক্ষতা, অনুমোদনবিহীন চিকিৎসা এবং দায়িত্বহীনতার ঘটনা ঘটে চলেছে। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে রোগীদের সীমিত বিকল্প থাকায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এসব ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

তাজিন ইসলামের চিকিৎসা নিয়ে আরও কিছু অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে এসেছে। পরিবারের দাবি, তাদের জানানো হয়েছিল খুলনা মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. মো. ইব্রাহিম সরদার অপারেশন করবেন। কিন্তু ব্যবস্থাপত্রে দেখা যায় ভিন্ন তথ্য। সেখানে অপারেশনকারী হিসেবে ডা. নূর মোহাম্মদের নাম উল্লেখ রয়েছে এবং অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগকারীর নাম হিসেবে লেখা আছে ডা. মনির। এই ভিন্নতা চিকিৎসা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নিবন্ধন নম্বর প্রতিটি চিকিৎসকের জন্য বাধ্যতামূলক। ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন বা সাইনবোর্ডেও তা উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু খাদিজা সেবা ক্লিনিকে যেসব চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের বিএমডিসি নম্বর কোথাও দেখা যায়নি। এমনকি স্থানীয় চিকিৎসক সমাজের অনেকেই তাদের পরিচয় সম্পর্কেও নিশ্চিত নন।

ঘটনার পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ করে সরে গেছে বলে জানা গেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আরও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুর রশিদ জানিয়েছেন, ঘটনাটি তাদের নজরে এসেছে এবং ক্লিনিকটি আনুষ্ঠানিকভাবে সিলগালা করার প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিন্নাতুল ইসলাম বলেছেন, পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু কমাতে সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে নানা অগ্রগতির পরও গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসূতি সেবার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত অ্যানেস্থেসিস্ট এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়া অপারেশন পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু অনেক বেসরকারি ক্লিনিক শুধুমাত্র ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ন্যূনতম মানদণ্ড ছাড়াই সিজারিয়ান অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে।

তাজিন ইসলামের মৃত্যু সেই বাস্তবতারই আরেকটি নির্মম উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে। একদিকে নবজাতকের কান্না, অন্যদিকে মায়ের নিথর দেহ—এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকাকে শোকাহত করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, যদি আগের ঘটনাগুলোর পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো আজ তাজিনকে প্রাণ হারাতে হতো না।

এখন পরিবারের একটাই দাবি—ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং যেন আর কোনো মায়ের জীবন এভাবে অবহেলায় ঝরে না যায়, তার নিশ্চয়তা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত