প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা আবারও তীব্র হয়ে উঠছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে নাকি আবারও বিস্ফোরিত হবে সামরিক উত্তেজনা— সেই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump প্রশাসন যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হলে নতুন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’ শুরু করার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের ভেতরে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় আগের সামরিক অভিযানের নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ পরিবর্তন করে নতুন নাম ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’ নিয়ে আলোচনা চলছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি পুনরায় বড় পরিসরের সামরিক অভিযান অনুমোদন দেন, তাহলে এই নতুন অভিযানের অধীনে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে।
ওয়াশিংটনের ভেতরে উদ্বেগের বড় কারণ হচ্ছে কূটনৈতিক আলোচনায় স্থবিরতা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার অব্যাহত বিস্তার। বিশেষ করে Strait of Hormuz ঘিরে পরিস্থিতি দিন দিন স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথকে কেন্দ্র করে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই মুখোমুখি। ইরান বারবার বলে আসছে, তাদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হলে তারা এই কৌশলগত জলপথে নিজেদের কর্তৃত্ব জোরদার করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মনে করে, হরমুজ প্রণালীতে অবাধ চলাচল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অংশ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, গত মাসে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সমাপ্ত হয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক বিকল্পগুলো খোলা রাখবে। যদিও পেন্টাগন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি, তবুও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা নতুন সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের পক্ষ থেকেও অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, পাঁচটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না হলে তারা নতুন কোনো আলোচনায় বসবে না। ইরানের দাবি অনুযায়ী, সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, বিশেষ করে Lebanon ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফেরত, যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছে তেহরান।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি Islamabad-এ অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা প্রত্যাশিত অগ্রগতি আনতে পারেনি। বরং উভয় পক্ষের অবস্থান আরও দূরে সরে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ প্রস্তাবকে ইরান “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর আগে ওয়াশিংটন ১৪ দফার একটি পরিকল্পনা দিয়েছিল, যা তেহরান একতরফা ও অসম বলে সমালোচনা করে। পরে ইরান নিজেদের প্রস্তাব দিলে সেটিকেও যুক্তরাষ্ট্র অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করে। ফলে আলোচনার পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান উত্তেজনার পেছনে শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক কারণ নয়, অর্থনৈতিক ও ভূকৌশলগত স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে সামান্য সংঘাতও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অনেক দেশ আশঙ্কা করছে, সংঘাত বাড়লে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিও নতুন করে চাপে পড়বে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও Israel যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আঞ্চলিক বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দেয় এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলোকেও সক্রিয় হতে উৎসাহিত করে। এরপর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। এখন আবার সেই যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে কিনা, তা নিয়েই উদ্বেগ বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই অনিশ্চয়তা গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। যুদ্ধের আশঙ্কায় অনেক এলাকায় মানুষ খাদ্য ও জ্বালানি মজুত করতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আতঙ্ক বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে তা শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতিই নয়, ভয়াবহ মানবিক সংকটও তৈরি করতে পারে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই এখন নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের কৌশল নিচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত বড় যুদ্ধ এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানে ফিরে আসাই সবার জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। কারণ পূর্ণাঙ্গ সংঘাত শুরু হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
এদিকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোও চাইছে না নতুন আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুরু হোক। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা সামান্য উসকানিও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করছেন কূটনীতিকরা।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। যুদ্ধবিরতির নাজুক ভারসাম্য টিকিয়ে রাখা যাবে, নাকি ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’ নামে নতুন সামরিক অধ্যায়ের সূচনা হবে— সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।