ফতুল্লায় গ্যাস বিস্ফোরণে এক পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
গ্যাস বিস্ফোরণ: পরিবারটির আর কেউ রইল না

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে এক পরিবারের পাঁচ সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে হাসপাতালের শয্যায় একে একে প্রাণ হারান পরিবারের স্বামী, স্ত্রী এবং তিন শিশু সন্তান। শেষ পর্যন্ত গৃহবধূ সালমা আক্তারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিভে যায় একটি স্বপ্নময় পরিবারের সকল জীবন।

গত রোববার সকালে ফতুল্লার গিরিধারা এলাকার গ্রাম বাংলা টাওয়ারের সামনের একটি বাসায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সময় সকাল আনুমানিক সাতটার দিকে হঠাৎ করেই রান্নাঘর থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরে। আশপাশের বাসিন্দারা শব্দ শুনে ছুটে এসে আগুনে দগ্ধ অবস্থায় পাঁচজনকে উদ্ধার করেন এবং দ্রুত তাদের ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়।

দগ্ধদের মধ্যে ছিলেন সবজি বিক্রেতা আবুল কালাম (৩৫), তার স্ত্রী সালমা আক্তার (প্রায় ৩০), এবং তাদের তিন সন্তান মুন্না (১২), মুন্নি (৭) ও কনা/কথা (৪)। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের শরীরের বড় অংশই মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছিল। কারও কারও শ্বাসনালীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তোলে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে অবস্থার অবনতি ঘটে ছোট ছেলে মুন্নার। দুর্ঘটনার পরপরই তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হলেও গুরুতর দগ্ধের কারণে সে আর বাঁচানো যায়নি। এরপর একে একে দুই কন্যা সন্তান মুন্নি ও কথা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তাদের মৃত্যুর খবর পরিবারের জন্য আরও বড় শোক বয়ে আনে।

সবশেষে স্বামী আবুল কালাম সোমবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর কয়েক দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছিলেন স্ত্রী সালমা আক্তার। তার শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ দগ্ধ হওয়ায় তাকে হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। তবে সব চিকিৎসা প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে শুক্রবার সকালে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পর দগ্ধ রোগীদের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। বিশেষ করে শ্বাসনালী ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের শারীরিক জটিলতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। প্রতিবেশীরা জানান, পরিবারটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও পরিশ্রমী। আবুল কালাম পেশায় সবজি বিক্রেতা ছিলেন এবং পরিবারের ভরণপোষণের জন্য প্রতিদিনই ভোরে বাজারে যেতেন। স্ত্রী সালমা সংসারের কাজ সামলাতেন এবং সন্তানদের লেখাপড়ার দিকে খেয়াল রাখতেন। হঠাৎ এমন দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসী বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন সকালে আবুল কালাম আড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি রান্নাঘরে আগের দিনের রান্না করা খাবার গ্যাসের চুলায় গরম করতে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে দিয়াশলাই জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। তাদের ধারণা, রান্নাঘরে দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস জমে ছিল, আর সেই জমাট গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশীরা জানান, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে আশপাশের কয়েকটি বাড়ি কেঁপে ওঠে। আগুনের শিখা দ্রুত পুরো রান্নাঘর থেকে ছড়িয়ে পড়ে বসার ঘর পর্যন্ত। তারা তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে গিয়ে দরজা ভেঙে ভেতর থেকে দগ্ধ অবস্থায় সবাইকে উদ্ধার করেন।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা জানান, দগ্ধ রোগীদের ক্ষেত্রে প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই ঘটনায় দগ্ধদের শরীরের বিস্তৃত ক্ষতি হওয়ায় কেউই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেননি। চিকিৎসকরা আরও জানান, গ্যাস লিকেজজনিত দুর্ঘটনা সাধারণত ঘরের ভেতর পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না থাকলে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন গ্যাস সংযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বাসার গ্যাস লাইনে দীর্ঘদিন ধরে লিকেজ ছিল, যা টের পাওয়া যায়নি। রান্নাঘরে সিলিন্ডার বা লাইনের গ্যাস জমে থাকায় সামান্য আগুনের স্পর্শেই বিস্ফোরণ ঘটে।

এদিকে, একসাথে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের পাশাপাশি আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা গ্যাস সংযোগ ব্যবস্থার নিয়মিত পরীক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আর না ঘটে।

একটি স্বাভাবিক সকালে শুরু হওয়া এই দিনটি যে একটি পরিবারের জন্য চিরবিদায়ের অধ্যায় হয়ে উঠবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ফতুল্লার এই দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নিঃশেষ করেনি, বরং পুরো এলাকাকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত