প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় পাহাড় কেটে প্রায় ১০ একর ভূমি সমতল করে সেখানে নতুন ইটভাটা নির্মাণের প্রস্তুতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এই পাহাড়ি এলাকায় পরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে ভূমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, যা এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বাঁশখাইল্ল্যা ঝিরি এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দা লোকমান হোসেন নামের এক ব্যক্তি ওই এলাকায় ইটভাটা নির্মাণের উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি করছেন। তিনি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
রোববার এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. ওসমান গনি। অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন ছাড়াই পাহাড় কাটা হচ্ছে এবং এতে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, ঝিরি, জলধারা ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, ইতোমধ্যে বড় একটি অংশ সম্পূর্ণভাবে সমতল করা হয়েছে এবং একটি পাহাড়ি ঝিরিও ভরাট করে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পাহাড় কাটার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এলাকায় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা এবং পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু পরিবেশ নয়, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
অভিযোগকারী মো. ওসমান গনি জানান, সংশ্লিষ্ট জমিটি যৌথভাবে কেনা হলেও পরে প্রতারণার মাধ্যমে পাহাড় কেটে ইটভাটার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পুরো পাহাড়ি এলাকা প্রায় সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
এদিকে অভিযুক্ত লোকমান হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিরোধের ফল এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তার ভাষায়, প্রশাসন সঠিকভাবে তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন।
স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের এক পরিদর্শক মো. নুর উদ্দিন বলেন, পাহাড় কাটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হতে পারে।
লামা উপজেলার মতো পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ও বনাঞ্চল স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা হলে মাটি ক্ষয়, পানির উৎস নষ্ট হওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে পরিবেশবান্ধব এবং আইনসম্মত উপায়ে।
এই ঘটনার পর এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কাটা ও ঝিরি ভরাটের মতো ঘটনা ঘটলেও কার্যকর নজরদারির অভাবে এসব কর্মকাণ্ড থেমে থাকছে না। তারা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, পার্বত্য অঞ্চলে ইটভাটা স্থাপনের আগে কঠোর পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। না হলে ভবিষ্যতে এসব অঞ্চল ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে লামার এই পাহাড় কাটার ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় বিরোধ নয়, বরং এটি পরিবেশ সুরক্ষা, আইন প্রয়োগ এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই পরিস্থিতির সমাধান করতে পারে।