প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বৈশ্বিক শেয়ারবাজার, বন্ড বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ৬৩ সেন্টে পৌঁছেছে। আগের দিনের তুলনায় এটি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেলের দামও বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলার ৪২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার খবর প্রকাশের পর থেকেই বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রোববারের ওই হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি জেনারেটরে আগুন লাগে বলে জানা গেছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ হয়নি, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও উত্তেজনা বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এই জলপথে জাহাজ চলাচল আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ইরান এই অঞ্চলে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকস সতর্ক করে জানিয়েছে, যদি হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। তাদের ধারণা, জুনের শেষ নাগাদ পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে এবং তখন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় সব খাতে পড়বে। পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতিও নতুন করে বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, যদি বছরের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির সংকট অব্যাহত থাকে এবং তেলের দাম ১৫০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করে, তাহলে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি আবারও দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার আরও বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব বন্ড বাজারেও পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৮৪ শতাংশে। একইভাবে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন বলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচক কমেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারেও বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে।
তবে চীনের শেয়ারবাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। দেশটির খুচরা বিক্রি ও শিল্প উৎপাদনের তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক সংকেত পাওয়া গেলে চীনের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আজ প্যারিসে জি-৭ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকেও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠছে। কারণ জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়লে তার প্রভাব বিশ্বের প্রতিটি দেশেই কমবেশি পড়বে।
সব মিলিয়ে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সামনের মাসগুলোতে বিশ্ববাজারে আরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।