১১৯ কোটি আত্মসাৎ মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ কারাগারে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ১৬ বার
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার ভুক্তভোগী হয়েছেন হাজার হাজার প্রবাসগামী বাংলাদেশি শ্রমিক।

সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ গত ২৫ মার্চ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন। পরে শুনানি শেষে আদালত আবেদন মঞ্জুর করেন।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর জন্য নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া এবং ফি উপেক্ষা করে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকার যেখানে একজন শ্রমিকের জন্য নির্ধারিত খরচ ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা ঠিক করেছিল, সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধাপে বাড়তি অর্থ আদায় করেন। এই অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১৯ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ শুধু অবৈধভাবে আদায় করেই থেমে থাকেননি অভিযুক্তরা, বরং অর্থপাচারের বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমেও তা গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধি, দুর্নীতি দমন আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই অর্থ লেনদেনের পেছনে একটি সুসংগঠিত চক্র সক্রিয় ছিল, যারা সরকারি প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

দুদকের আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জামিনে মুক্তি পেলে তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এছাড়া সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট বা প্রভাবিত করার আশঙ্কাও রয়েছে। এ কারণেই তাকে মামলায় গ্রেফতার দেখানো জরুরি বলে আদালতকে জানানো হয়।

এক-এগারোর সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচিত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক সংস্কার, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় তার নাম সামনে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জানা গেছে, গত ২৩ মার্চ দিবাগত রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন আদালতে হাজির করা হলে পল্টন মডেল থানার একটি মামলায় তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর আরও কয়েকটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হয়।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক দেশটিতে কাজের উদ্দেশ্যে যান। এই শ্রমবাজারকে ঘিরে অতীতে বিভিন্ন সময় সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং নিয়োগ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্রের কারণে অনেক শ্রমিককে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশ যেতে হয়। পরে বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে অনেকেই চরম আর্থিক সংকটে পড়েন।

বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমবাজারে দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, বরং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে গন্তব্য দেশগুলোর আস্থাও কমে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, বিদেশগামী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দালাল ও অবৈধ এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তারা মনে করেন, শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম অনেকটাই কমে আসবে।

এদিকে দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মামলার আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক কাগজপত্র এবং বিদেশি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতির মামলায় শুধু গ্রেফতারই যথেষ্ট নয়, বরং আদালতে অভিযোগ প্রমাণ এবং অবৈধ অর্থ উদ্ধারের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বড় অঙ্কের আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ঘটনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, বিদেশগামী শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কারণ বিদেশে কাজ করতে যাওয়া অধিকাংশ মানুষই গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে আসেন। তাদের অনেকেই জমি বিক্রি, ঋণ বা ধারদেনা করে বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেই সুযোগকে পুঁজি করে কেউ যদি অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়, তাহলে তা শুধু আইনি অপরাধ নয়, মানবিক দিক থেকেও গভীর অনৈতিকতা।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের মধ্যে এই মামলা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। এখন নজর থাকবে তদন্ত কতদূর এগোয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় কী ফল আসে তার দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত