প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে সুষম অংশগ্রহণের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সরকারি চাকুরিক্ষেত্রে নারীর প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে মর্মে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নারী অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। গত মঙ্গলবার সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে প্রেরিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে নারী কোটা অবিলম্বে পুনর্বহালের জন্য জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। মহিলা পরিষদের এই দাবি দেশের সচেতন মহল, নারী সমাজ এবং সুশীল সমাজের মধ্যে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা নারীর ক্ষমতায়ন ও সম অধিকার নিশ্চিত করার লড়াইয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া কেবল নিছক কোনো পরিসংখ্যানগত পতন নয়। এটি সামগ্রিকভাবে দেশের নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক সমঅধিকার এবং একটি প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত বড় ধরনের নীতিগত ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে ও সমাজে নারীর যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, কর্মসংস্থানে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের অভাবে সেই গতিধারা মার খাচ্ছে বলে মনে করছেন নারী অধিকারকর্মীরা। প্রশাসন ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নারীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে জেন্ডার সমতা অর্জনের লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে সর্বমোট ছাপ্পান্ন শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের সুযোগ ছিল। তৎকালীন কোটা ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য ত্রিশ শতাংশ, নারী প্রার্থীদের জন্য দশ শতাংশ, দেশের অনগ্রসর জেলাগুলোর জন্য দশ শতাংশ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রার্থীদের জন্য পাঁচ শতাংশ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের জন্য এক শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল। এই সুবিন্যস্ত কাঠামোর ফলে প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি নারীরাও সরকারি চাকরিতে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পেতেন, যা সমাজে তাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে আসছিল।
কিন্তু ২০১৮ সালে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা এক বিশাল ও নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলনের মুখে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়। তবে সেই সময় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কোটা বাতিল করা হলেও সরকারি সেবার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে কোটা ব্যবস্থা আগের মতো বহাল রেখেই একটি সরকারি পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। এই পরিবর্তনের পর থেকেই সরকারি উচ্চপদগুলোতে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের দৃষ্টিগোচর হয় এবং এ বিষয়ে তারা ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ কোটা পদ্ধতি বাতিলের পূর্বের সিদ্ধান্তটিকে অবৈধ ঘোষণা করে একটি রায় প্রদান করে। এই আইনি লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় সে বছরের জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায়ে সরকার, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ সংস্থার চাকরির সকল গ্রেডে মেধার ভিত্তিতে তিরানব্বই শতাংশ নিয়োগ দেওয়ার রায় ঘোষণা করে। আপিল বিভাগের এই নির্দেশনার আলোকেই সে বছরের ২৩ জুলাই সরকার একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে, যেখানে চাকরিতে তিরানব্বই শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে এবং বাকি পদগুলো বিভিন্ন কোটার জন্য বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়।
নতুন এই প্রজ্ঞাপন ও নির্ধারিত কোটা কাঠামো অনুযায়ী, সরকারি চাকুরিক্ষেত্রে পাঁচ শতাংশ পদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য, এক শতাংশ পদ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য এবং অবশিষ্ট এক শতাংশ পদ শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। কিন্তু অত্যন্ত লক্ষণীয় বিষয় হলো, আপিল বিভাগের এই পরিবর্তিত রূপরেখায় পূর্বে প্রচলিত দশ শতাংশ নারী কোটা সম্পূর্ণ বাদ পড়ে যায়। কোটা পদ্ধতি সংস্কারের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াকরণ ও আইনি মারপ্যাঁচে নারী কোটা বাদ পড়ার বিষয়টি যে ভবিষ্যতে চাকুরিক্ষেত্রে নারী প্রতিনিধিত্বের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে তখনই নানা মহলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতি সেই আশঙ্কারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, অতীতে যখন সরকারি চাকরিতে দশ শতাংশ নারী কোটা বহাল ও কার্যকর ছিল, সেই সুবর্ণ সময়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস পরীক্ষার চৌত্রিশতম, পঁয়ত্রিশতম, ছত্রিশতম এবং সাইত্রিশতম এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও বড় বিসিএস পরীক্ষাগুলো অত্যন্ত সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সময়গুলোতে নারী প্রার্থীরা তাদের জন্য নির্ধারিত কোটার সুবাদে এবং নিজেদের মেধার সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে সময় প্রশাসনে নারী ক্যাডারদের উপস্থিতি ছিল বেশ দৃশ্যমান এবং তা নারী সমাজের অগ্রযাত্রায় এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল, যা পরবর্তীতে কোটা হ্রাসের কারণে কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই চব্বিশতম বিসিএসসহ বিভিন্ন পর্ষদের পর সম্প্রতি প্রকাশিত পঁয়তাল্লিশতম বা সর্বশেষ গত ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সর্বশেষ প্রকাশিত এই ফলাফলে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন বা পিএসসি দেশের বিভিন্ন ক্যাডার পদে মোট এক হাজার তিন শ চৌত্রিশ জন প্রার্থীকে চাকুরিতে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল সুপারিশপ্রাপ্তদের তালিকার মধ্য থেকে নারী প্রার্থীর হার মারাত্মকভাবে কমে মাত্র বাইশ শতাংশে এসে ঠেকেছে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য পতন এবং যা দেশের নারী সমাজের জন্য একটি বড় হতাশার বার্তা নিয়ে এসেছে।
সরকারি চাকুরিক্ষেত্রে এই ধরনের নিম্নমুখী প্রতিনিধিত্ব দেশের সামগ্রিক নারী উন্নয়ন নীতি এবং এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। নারীরা আজ দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও কূটনীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখলেও কেবল কাঠামোগত নীতিমালার অভাবে যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হতে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের পথকে অবরুদ্ধ করে দেবে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মনে করে, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কোনো কাঙ্ক্ষিত জাতীয় উন্নয়ন কিংবা টেকসই গণতন্ত্র অর্জন সম্ভব নয়, আর তাই নীতিনির্ধারক মহলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সময় এখনই এসেছে।
সব মিলিয়ে, সরকারি চাকরিতে নারীর হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ার এই বাস্তবতায় মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত নারী কোটা পুনর্বহালের দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়ের জোরালো দাবি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রশাসনযন্ত্রে নারীর ভারসাম্যপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। সরকার ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এবং দেশের নারী সমাজকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন—এমনটাই এখন দেশের সচেতন ও বিবেকবান নাগরিকদের সর্বসম্মত প্রত্যাশা।