সর্বশেষ :

ড. ইউনূসের পরিকল্পনায় ছিল বিএনপিকে মাইনাস করা: রাশেদ খাঁন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
ড. ইউনূসের পরিকল্পনায় ছিল বিএনপিকে মাইনাস করা: রাশেদ খাঁন

প্রকাশ: ২৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিগত সময়গুলোতে সংঘটিত বিভিন্ন নাটকীয় পটপরিবর্তন, ক্ষমতার পালাবদল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনকাল নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে। দেশের রাজনীতিতে নানা সমীকরণ ও পর্দার পেছনের বহু অজানা অধ্যায় নিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য সামনে আস আসছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তুলছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে রাজনীতি থেকে মাইনাস বা অপসারণ করার একটি সুদূরপ্রসারী গোপন পরিকল্পনা ছিল বলে গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। তাঁর এই বিস্ফোরক মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার ঝড় তুলেছে এবং বিভিন্ন মহলে নতুন করে মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে।

গত মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের মিলনায়তনে ‘ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বিভাজন নয়, ঐক্য’ শীর্ষক শিরোনামে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি বা বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত থেকে রাশেদ খাঁন এই সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো উত্থাপন করেন। ওই সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিগত সরকারের বিভিন্ন নীতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার নানা দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনকাল এবং তাঁর তৎকালীন রাজনৈতিক ভূমিকা ও চিন্তাভাবনা নিয়ে বেশ কিছু নজিরবিহীন তথ্য ও মূল্যায়ন তুলে ধরেন, যা উপস্থিত রাজনৈতিক কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করে।

আলোচনা সভায় রাশেদ খাঁন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন যে, বিগত দিনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান কৌশল ছিল দেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপিকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া বা মাইনাস করা। তবে এই বিস্ফোরক অভিযোগ উত্থাপন করার পাশাপাশি তিনি এও পরিষ্কার করেন যে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ও নোবেলজয়ীর প্রতি তাঁর এবং তাঁদের দলের মনে গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান এখনো বহাল রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা আর রাষ্ট্রীয় রাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ যে সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়, তা নিজের বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে ফুটিয়ে তোলেন তিনি।

রাশেদ খাঁন তাঁর বক্তব্যে আরও দাবি করেন যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস কেবল বিএনপিকে মাইনাস করার পরিকল্পনাই করেননি, বরং তাঁর দীর্ঘমেয়াদি মূল পরিকল্পনা ছিল নিজের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা এবং যথাসময়ে কোনো ধরনের নির্বাচন না দিয়েই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকার একটি সুদূরপ্রসারী নীল নকশা বাস্তবায়ন করা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি বিলীন বা কোণঠাসা হয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তী প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিএনপিকেও মাঠের রাজনীতি থেকে কৌশলে সরিয়ে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। আর এই পুরো পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের মূলধারার প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে বিশেষ কিছু রাজনৈতিক শক্তি যেমন জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন উদীয়মান দল এনসিপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার একটি অসাংবিধানিক পরিবেশ তৈরি করা।

সরকারের অন্দরমহলের বিভিন্ন স্পর্শকাতর তথ্য ও গোপন অভিসন্ধি সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাশেদ খাঁন দাবি করেন যে, সেই সময় সরকার পরিচালনার মূল জায়গায় বা খোদ প্রশাসনের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদেরও বেশ কয়েকজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ও শুভানুধ্যায়ী যুক্ত ছিলেন। আর সেই অভ্যন্তরীণ ও বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর মাধ্যমেই মূলত তাঁদের কাছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই সুদূরপ্রসারী গোপন পরিকল্পনার যাবতীয় তথ্য এবং খসড়া নীল নকশা এসে পৌঁছেছিল। এই তথ্যগুলো পাওয়ার পরই তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং বহুদলীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন গভীর সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমীকরণ বাস্তবায়নের এই অপচেষ্টা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চরম ঝুঁকিতে ফেলতে পারত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনেকে সাধারণ ধারণার বশে মনে করে থাকেন যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বেচ্ছায় এবং স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। কিন্তু রাশেদ খাঁন এই প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে দাবি করেন যে, ড. ইউনূস স্বেচ্ছায় কখনোই ক্ষমতা ছাড়তে বা নির্বাচন দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। বরং দেশের আপামর ছাত্র-জনতা ও রাজনৈতিক শক্তির দুর্বার আন্দোলন এবং তীব্র জনমতের চাপে পড়ে তাঁকে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপ এবং আন্দোলনের মাধ্যমেই আদতে জোরপূর্বক তাঁর কাছ থেকে নির্বাচন আদায় করে নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জোরালো দাবি জানান।

শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে রাশেদ খাঁন দাবি করেন যে, সেই সংকটময় মুহূর্তে দেশের জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি কখনোই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক তা আন্তরিকভাবে চায়নি। তাঁদের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য এমন ছিল যা সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করার ইঙ্গিতবহ ছিল। তৎকালীন সময়ে ওই দলগুলোর পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় এই মর্মে বক্তব্য প্রচার করা হয়েছিল যে, নির্ধারিত সেই দ্বাদশ বা বিশেষ ওই সময়ে বাংলাদেশে কোনো ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে আটকে দিয়ে একটি বিশেষ অগণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এই অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিতেই বিএনপি ও দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে লড়াই চালিয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বর্তমান নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়ে রাশেদ খাঁন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিছু দলের হুঁশিয়ারি ও হুমকির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন যে, নির্বাচিত কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে অতীতে বা বর্তমানে কোনো ধরনের গণঅভ্যুত্থানের হুমকি দেওয়া বা তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা সম্পূর্ণ অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক। বর্তমান বিএনপি সরকার কোনো পেছনের দরজা দিয়ে নয়, বরং সরাসরি দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের পবিত্র ভোটে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেছে। তাই জনগণের রায়ে প্রতিষ্ঠিত একটি বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক গণঅভ্যুত্থানের বা অস্থিতিশীলতা তৈরির যেকোনো ধরনের হুমকি দেওয়া থেকে অবিলম্বে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর প্রতি তিনি অত্যন্ত জোরালো আহ্বান জানান।

সব মিলিয়ে, জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ওই আলোচনা সভায় রাশেদ খাঁনের দেওয়া এই সুদূরপ্রসারী বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন উত্তাপ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনকালের পেছনের গোপন রাজনৈতিক সমীকরণ, বিএনপিকে মাইনাস করার কথিত ফর্মুলা এবং নির্বাচন ঠেকাতে তৎপর থাকার যে অভিযোগ তিনি তুলেছেন, তা আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে অুণ্ণ রাখতে এবং দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার মাধ্যমেই কেবল একটি শক্তিশালী ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন সম্ভব বলে সচেতন নাগরিক সমাজ বিশ্বাস করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত