দেড় মাসের তলানিতে স্বর্ণের বাজার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ১৭ বার
দেশের স্বর্ণ রুপার নতুন দাম

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে টানা অস্থিরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। সপ্তাহের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দাম নেমে যায় গত দেড় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে। যদিও পরবর্তীতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে স্বর্ণের দাম, তবুও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাজারকে এখনো অস্থির করে রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাময়িক পুনরুদ্ধার হলেও স্বর্ণবাজারের সামনে এখনো বড় ধরনের চাপ রয়ে গেছে।

সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম কিছুটা বাড়লেও দিনের শুরুতে তা ৩০ মার্চের পর সবচেয়ে নিচের অবস্থানে নেমে আসে। গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৯টা ৭ মিনিটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫৪৬ দশমিক ৪ ডলার, যা আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেশি। তবে ফিউচার বাজারে স্বর্ণের দাম কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৪৯ দশমিক ৭০ ডলারে নেমে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন স্বর্ণের বদলে উচ্চ ফলনশীল সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন, যার বড় প্রভাব পড়ছে স্বর্ণের বাজারে।

বিশ্ব অর্থনীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এই মূল্যপতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নিয়ে কঠোর অবস্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি করেছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছরের শেষ নাগাদ সুদের হার কমতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনা প্রায় নেই বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বরং সুদের হার আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই বন্ড বাজারে চাহিদা বেড়েছে এবং স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম ট্রেডু ডটকমের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক নিকোস জ্যাবৌরাস বলেছেন, বর্তমান মূল্যপতন পুরোপুরি কাঠামোগত এবং এটি এখনো দীর্ঘমেয়াদি মন্দাবাজারের ইঙ্গিত নয়। তার মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা এখনো স্বর্ণকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। তবে উচ্চ সুদের হার স্বর্ণের মতো অ-ফলনশীল সম্পদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ স্বর্ণ থেকে নিয়মিত সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না, ফলে বিনিয়োগকারীরা বেশি লাভের আশায় বন্ড বা অন্যান্য সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বিশ্ববাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ইতোমধ্যে প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে আরও কঠোর মুদ্রানীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সরাসরি স্বর্ণবাজারেও প্রভাব ফেলছে। সাধারণত বৈশ্বিক সংকটের সময়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ উচ্চ সুদের হার এবং বন্ডের বাড়তি ফলন স্বর্ণের আকর্ষণ কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও স্বর্ণের বাজার কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না।

সোমবার টোকিও থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বন্ড বাজারেও বড় ধরনের চাপ লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ফলন বেড়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা করছেন। আর এই আশঙ্কাই বন্ডের চাহিদা বাড়াচ্ছে।

সিএমই গ্রুপের ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে এখন ধারণা করা হচ্ছে বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় ৪০ শতাংশ। এর ফলে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজার, বন্ড বাজার এবং স্বর্ণবাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে বড় বড় বিনিয়োগকারী ব্যাংকগুলোও স্বর্ণের ভবিষ্যৎ দাম নিয়ে পূর্বাভাস সংশোধন শুরু করেছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান ২০২৬ সালের স্বর্ণের গড় মূল্য পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে। আগে তারা প্রতি আউন্স স্বর্ণের সম্ভাব্য দাম ৫ হাজার ৭০৮ ডলার বললেও এখন তা কমিয়ে ৫ হাজার ২৪৩ ডলারে নামিয়েছে। ব্যাংকটির বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি, সুদের হার এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা আগামী কয়েক মাস বাজারকে অত্যন্ত অস্থির রাখবে।

তবে বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ইরান সংকটের সমাধান এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমে এলে স্বর্ণের বাজার আবারও স্থিতিশীল হতে পারে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে পরিষ্কার বার্তা এলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা ফিরতে পারে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।

স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দাম সামান্য বেড়ে প্রতি আউন্স ৭৫ দশমিক ৯৯ ডলারে পৌঁছেছে। প্লাটিনামের দাম প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে এবং প্যালাডিয়ামের দামও কিছুটা বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পখাতে চাহিদা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি এসব ধাতুর বাজারেও বড় প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের বাজারেও আন্তর্জাতিক দামের এই ওঠানামার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে দাম কমে গেলে দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম সমন্বয়ের সম্ভাবনা থাকে। তবে ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।

বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, স্বর্ণ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি এর দামে প্রভাব ফেলছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ স্বর্ণবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত