আর্থিক খাতে আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছতার আহ্বান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
আর্থিক খাতে আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছতার আহ্বান

প্রকাশ: ২১ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অনিয়ম, দুর্বল নজরদারি এবং আস্থাহীনতার সংকট কাটিয়ে উঠতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সততা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনীতির টেকসই অগ্রযাত্রার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। আর এ লক্ষ্য অর্জনে কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক সংস্কার ও কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।

বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড রিপোর্টিং’ (এফএআর) সামিটে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে দেশের শীর্ষস্থানীয় হিসাববিদ, নিরীক্ষক, ব্যাংকার, অ্যাকচুয়ারি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন। আলোচনায় উঠে আসে দেশের আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থা, অডিট কাঠামো এবং ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল, যার ফলে আর্থিক প্রতিবেদন, অডিট প্রক্রিয়া এবং নজরদারি ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল শাসন কাঠামোর কারণে দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি মনে করেন, এসব কারণে দেশের অর্থনীতি এখন একটি সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ভুয়া তথ্য এবং বিভ্রান্তিকর আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবহার করে কিছু প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেছে, যার ফলে প্রকৃত ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলো ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ থেকে পিছিয়ে পড়েছে। এতে বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তার মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন এবং বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি। বিদ্যমান দুর্বলতার কারণে ব্যাংক ও বেসরকারি খাতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও মালিকানার যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাগুলো আর্থিক খাতকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমানতকারীদের অর্থে পরিচালিত ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালিত হয়েছে, যা গভর্ন্যান্স ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ব্যর্থতা। এ ধরনের স্বার্থের সংঘাত দূর করে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশে বাংলাদেশ এখন একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জেপি মরগান চেজসহ লন্ডন ও হংকংভিত্তিক কয়েকটি বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান দেশের বাজারে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন যদি বিশ্বাসযোগ্য না হয় এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুসরণ না করা হয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে না। তার ভাষায়, বিনিয়োগকারীরা যখন আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দিহান হন, তখন তাদের আস্থা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং সেটি অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়।

এফএআর সামিটে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি আর্থিক খাতের সংস্কারে সমন্বিত নীতিমালা ও গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আর্থিক রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়ন এবং অডিট প্রক্রিয়ার আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তার মতে, প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ রিপোর্টিং ব্যবস্থা ছাড়া আর্থিক খাতে প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়।

সম্মেলনে বক্তারা একমত হন যে, দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান কাঠামোতে মৌলিক সংস্কার না হলে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা এবং অডিট ব্যবস্থাকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।

আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আর্থিক খাতে আস্থা ফেরাতে কেবল নীতিগত সংস্কার নয়, বরং বাস্তব প্রয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রতিবেদন ব্যবস্থাকে আরও গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে বাংলাদেশও নানা চাপের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে আর্থিক খাতের দুর্বলতা যদি দ্রুত সমাধান না করা হয়, তাহলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সঠিক নীতি, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই খাত আবারও আস্থার জায়গায় ফিরতে পারে।

সব মিলিয়ে এফএআর সামিটে উঠে আসা আলোচনা দেশের আর্থিক খাত সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন সময় কথার নয়, বাস্তব পদক্ষেপের। আর সেই পদক্ষেপের কেন্দ্রে থাকতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের অঙ্গীকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত