প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো সিরাজগঞ্জের কামারপল্লীগুলোও যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। বছরের অন্য সময় যেসব কামারশালায় তুলনামূলক নীরবতা বিরাজ করে, সেখানে এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত থেমে নেই আগুনের ঝলকানি আর লোহার ওপর হাতুড়ির আঘাতের টুংটাং শব্দ। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দা, ছুরি, চাপাতি ও বঁটির বাড়তি চাহিদা পূরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার হাজারো কামার শিল্পী।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল, বাহিরগোলা, কাজিপুর, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া ও বেলকুচিসহ বিভিন্ন এলাকার কামারপল্লীতে এখন যেন এক ভিন্ন দৃশ্য। ছোট ছোট টিনশেড ঘর, পুরোনো চুল্লি আর কয়লার আগুনের পাশে ঘাম ঝরিয়ে কাজ করছেন কারিগররা। কেউ আগুনে লাল হয়ে যাওয়া লোহা হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছেন, কেউ পুরোনো ছুরি ও দা শান দিচ্ছেন, আবার কেউ হাপর টেনে আগুনে বাতাস দিচ্ছেন। চারদিকে শুধু আগুনের উত্তাপ আর শ্রমের শব্দ।
সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল গড়াতেই কামারশালাগুলোতে ভিড় বাড়তে শুরু করে। কেউ নতুন দা কিনতে এসেছেন, কেউ পশু জবাইয়ের জন্য ধারালো ছুরি খুঁজছেন, আবার অনেকে বাড়িতে থাকা পুরোনো সরঞ্জাম শান দিয়ে নিচ্ছেন। ক্রেতাদের সঙ্গে দরদাম আর শিল্পীদের ব্যস্ততার দৃশ্য পুরো এলাকাকে উৎসবমুখর করে তুলেছে।
শিয়ালকোল এলাকার কামার শিল্পী সাইদুল ইসলাম প্রায় দুই দশক ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে করতে ক্লান্ত হলেও মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। তিনি বলেন, সারা বছর তেমন কাজ থাকে না। কিন্তু কোরবানির ঈদ এলেই আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এখন প্রতিদিন অনেক অর্ডার আসছে। কেউ নতুন দা বানাতে দেন, কেউ পুরোনো ছুরি শান দিতে আনেন। তবে কাঁচামালের দাম এত বেড়েছে যে আগের মতো লাভ করা যাচ্ছে না।
কামার শিল্পীদের অভিযোগ, লোহা, কয়লা ও অন্যান্য উপকরণের দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অথচ সেই তুলনায় পণ্যের দাম খুব বেশি বাড়ানো যায় না। কারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় রাখতে হয়। ফলে কঠোর পরিশ্রম করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত লাভ হাতে আসে না।
তবুও পেশাটি ছাড়তে পারছেন না তারা। কারণ এটি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি ঐতিহ্য। অনেক কামার পরিবারের শিশুরাও ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে হাতুড়ি ধরা শিখছে। কেউ আগুনে লোহা ধরার কাজ করছে, কেউ শান দেওয়ার কৌশল আয়ত্ত করছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প এখনো গ্রামীণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে টিকে আছে।
সিরাজগঞ্জের বাহিরগোলা এলাকা থেকে দা ও চাপাতি কিনতে আসা আশরাফ আলী বলেন, কোরবানির সময় ভালো মানের ধারালো সরঞ্জাম খুব দরকার হয়। বাজারে অনেক ধরনের পণ্য পাওয়া যায়, কিন্তু কামারদের হাতে তৈরি জিনিসের মান আলাদা। এগুলো টেকসই হয় এবং কাজেও সুবিধা হয়।
কেবল নতুন সরঞ্জাম বিক্রিই নয়, পুরোনো দা-ছুরি শান দেওয়ার কাজেও এখন বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে কামারদের। ঈদের আগে অনেকেই তাদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম নতুনের মতো ধারালো করে নিতে চান। ফলে প্রতিটি কামারশালার সামনে এখন দীর্ঘ অপেক্ষা দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি এলাকায় কামারপল্লী ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিকাজ, গৃহস্থালি কাজ ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্য মানুষ পুরোপুরি কামারদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে শিল্প কারখানায় তৈরি পণ্য বাজারে আসায় এই ঐতিহ্যবাহী পেশা কিছুটা সংকটে পড়ে। তারপরও কোরবানির ঈদ এলে আবারও প্রাণ ফিরে পায় কামারশিল্প।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিরাজগঞ্জের নয়টি উপজেলায় প্রায় তিন হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। অনেকে ছোট আকারে নিজ বাড়িতে কাজ করেন, আবার কেউ বাজারকেন্দ্রিক কামারশালায় শ্রম দেন। ঈদের মৌসুম তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই কয়েক সপ্তাহের আয়ের ওপর অনেক পরিবারের কয়েক মাসের সংসার চলে।
তবে কামার শিল্পীরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেলে এ শিল্প আরও এগিয়ে যেতে পারে। তারা সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল সরবরাহে সহায়তা চান। অনেকের মতে, তরুণ প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, কারণ পরিশ্রম বেশি হলেও আয় তুলনামূলক কম। ফলে ধীরে ধীরে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কামার শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। তাই এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে কোরবানির সময় এসব কারিগরের চাহিদা বাড়লেও বছরের অন্য সময় তাদের আয় কমে যায়। এ কারণে সারা বছর কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে শিল্পীরা আরও স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
কোরবানির ঈদের আগে সিরাজগঞ্জের কামারপল্লীগুলো এখন যেন শ্রম, ঐতিহ্য আর জীবিকার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আগুনের লাল আভা, হাতুড়ির ছন্দ আর মানুষের ভিড়ে মুখরিত এসব কামারশালা মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তির যুগেও কিছু পেশা এখনো মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির গভীরে গেঁথে আছে। ঈদের আনন্দের প্রস্তুতির আড়ালে তাই কামার শিল্পীদের এই নিরলস শ্রমও হয়ে উঠেছে উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।