প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায় একটি নতুন স্থাপিত নলকূপ থেকে হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠার ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। গৃহস্থালির পানি উত্তোলনের জন্য খনন করা ওই নলকূপে পানি তোলার সময় আকস্মিকভাবে আগুন ধরে যাওয়ার পর বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। ঘটনাস্থলে এখনো অনবরত গ্যাস নির্গমনের কারণে এলাকায় উদ্বেগ ও কৌতূহল দুই-ই বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের কোরবানপুর গ্রামের মালেক কন্ট্রাক্টর বাড়ির ব্যবসায়ী মো. হাসানের বাড়িতে শনিবার একটি নলকূপ স্থাপনের কাজ শেষ হয়। প্রায় ১১০ ফুট গভীর পর্যন্ত খনন শেষে মিস্ত্রিরা যখন পানি তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ করে নলকূপের মুখ থেকে দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতিতে আগুন জ্বলে ওঠে। মুহূর্তেই পরিস্থিতি আতঙ্কজনক হয়ে পড়ে।
ঘটনার পর স্থানীয়রা দ্রুত উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করেন। পরে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পর আগুন নিভে গেলেও নলকূপ থেকে গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকে বলে স্থানীয়রা জানান। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আশপাশের এলাকা থেকে উৎসুক মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় জমায়।
ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে রোববার বিকেলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (BAPEX)-এর একটি বিশেষ টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে। টিমটি নলকূপের ভেতর থেকে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করে এবং প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে।
পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা নোয়াখালীর শাহজাদপুর গ্যাস ফিল্ডের সহকারী ব্যবস্থাপক সতীশ চন্দ্র বর্মন জানান, মাল্টি-গ্যাস মনিটরের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে নলকূপ এলাকায় অক্সিজেনের উপস্থিতি প্রায় ৩২ শতাংশ। তিনি আরও জানান, হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি, তবে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা দাহ্য প্রকৃতির।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মাটির নিচে ছোট কোনো গ্যাস পকেট থেকে এই নির্গমন ঘটতে পারে। আরেকটি সম্ভাবনা হলো, গভীর স্তরে থাকা প্রাকৃতিক গ্যাসের কোনো ক্ষুদ্র ফাটল বা চ্যানেলের মাধ্যমে গ্যাস উপরে উঠে আসছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তারিত ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে নলকূপের উপরের অংশ খুলে প্রায় ২০ ফুট পিভিসি পাইপ সংযুক্ত করা হয়েছে, যাতে নিয়ন্ত্রিতভাবে গ্যাস বের হয়ে যেতে পারে এবং কোনো ঝুঁকি তৈরি না হয়। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল সোমবার পূর্ণাঙ্গ সার্ভে পরিচালনা করে গ্যাসের উৎস, পরিমাণ এবং ভূগর্ভস্থ পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করবে বলে জানা গেছে।
এদিকে ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে কেউ কেউ একে প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য ক্ষুদ্র উৎস হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে রাতের বেলা নলকূপ থেকে আগুন জ্বলে ওঠার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম জানান, ঘটনার পরপরই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং বাপেক্সসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নেই এবং এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঘটনাটি যদি প্রাকৃতিক গ্যাস নির্গমনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-তাত্ত্বিক ইঙ্গিত হতে পারে। তবে আপাতত বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
ঘটনাস্থলে ভিড় করা স্থানীয়রা জানান, নলকূপ খননের পর এমন ঘটনা আগে কখনো দেখেননি তারা। অনেকেই বিষয়টিকে বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করছেন। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে বিষয়টি আরও দ্রুত আলোচনায় আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ গ্যাস পকেট থেকে এমন নির্গমন বিরল নয়, তবে এটি প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হয়েছে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চলছে।
সব মিলিয়ে ফেনীর দাগনভূঞার এই নলকূপে আগুন জ্বলে ওঠার ঘটনা এখন শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় পর্যায়েও কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে। বাপেক্সের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পরই জানা যাবে এটি আসলে কোনো সম্ভাব্য গ্যাস ক্ষেত্রের ইঙ্গিত নাকি নিছকই ভূগর্ভস্থ একটি স্বাভাবিক গ্যাস পকেটের ফলাফল।