প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় বিচারিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত মোড় নিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারকে কেন্দ্র করে শোকে স্তব্ধ হওয়া পরিবারের মাঝে এখন কেবলই এক চিলতে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর প্রাক্কালে ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন। তার এই দাবি কেবল একজন বাবার আর্তনাদ নয়, বরং সমাজে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি কঠোর হুশিয়ারিও বটে।
সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে ছিল টানটান উত্তেজনা। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বিচারক মাসরুর সালেকীন সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেন। এই মামলার সাক্ষীদের তালিকায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় প্রতিবেশী। এই ব্যক্তিদের সাক্ষ্যই হত্যাকাণ্ডের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হবে। বিচারিক কাঠামোর প্রতিটি ধাপে এই সাক্ষীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের প্রদত্ত তথ্যই অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির পথ সুগম করবে।
অন্যদিকে, মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছে। সকালে পৌনে ৯টার দিকে তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। তাদের আদালতে আনার সময় উৎসুক জনতা ও ভুক্তভোগীর স্বজনদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত এই বিচার প্রক্রিয়ার শুরু দেখে ন্যায়বিচারের আশায় বুক বেঁধেছেন রামিসার বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজন। আসামিদের উপস্থিতিতে আদালতের পরিবেশ ছিল গম্ভীর এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের দৃষ্টি ছিল তাদের প্রতি।
উল্লেখ্য যে, গত সোমবার আদালত এই আলোচিত মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আনুষ্ঠানিক আদেশ প্রদান করেন। একই সাথে মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লাসহ মোট সতেরো জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার জন্য সমন জারি করা হয়। বিচারক মাসরুর সালেকীনের এই দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছেন আইনজীবী মহল এবং সচেতন নাগরিক সমাজ। শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য অপরাধের বিচারকার্য যেন কোনোভাবেই দীর্ঘসূত্রতায় আটকে না যায়, সে বিষয়ে আদালত যথেষ্ট সজাগ বলে মনে হচ্ছে।
স্মরণ করা যেতে পারে, মিরপুরের পল্লবীর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি যখন প্রকাশ্যে এসেছিল, তখন সারাদেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। একটি আট বছরের শিশুর ওপর এমন অমানবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। রামিসার পরিবার আজও সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের প্রতিদিনের পথচলায় রামিসার হাসি যেন আজও তাদের কানে বাজে। বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার সেই অশ্রুসজল চাহনি প্রমাণ করে যে, সন্তানের হারানো বেদনার চেয়ে বড় কোনো শাস্তি পৃথিবীতে নেই। তাই আইনের মাধ্যমে তিনি আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বা সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যেতে চান, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুর জীবনে এমন করুণ পরিণতি নেমে না আসে।
আদালতের কার্যক্রমের প্রতিটি মুহূর্ত এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক ও আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যদান শেষ হলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সকল রহস্য উন্মোচিত হবে। মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা আশা প্রকাশ করেছেন যে, সাক্ষীদের বক্তব্যে আসামিদের অপরাধের স্বরূপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে এবং বিচারক তা আমলে নিয়ে যথাযথ রায় প্রদান করবেন। তিনি বলেন, তার সন্তান হত্যার বিচার যেন স্বচ্ছ হয় এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়, যাতে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিটি মানুষের, আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে কাজ করছে তা আশাব্যঞ্জক। শিশু রামিসা হত্যার এই মামলাটি কেবল একটি অপরাধের বিচার নয়, এটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি প্রয়াস। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি সাক্ষ্যপ্রমাণ সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যায়, তবে খুব দ্রুতই মামলার চূড়ান্ত রায় পাওয়া সম্ভব। বিচারিক আদালতের এই দৃঢ় অবস্থান রামিসার পরিবারের মতো অসহায় মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
পরিশেষে, আট বছরের রামিসার মৃত্যু যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরের মানুষকে আজ শিশুদের সুরক্ষার জন্য সোচ্চার হতে হবে। অপরাধীদের বিচার হওয়াটাই একমাত্র কাম্য নয়, বরং অপরাধের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে তা নির্মূল করাই হবে রামিসার জন্য প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন। বিচারক মাসরুর সালেকীনের ট্রাইব্যুনালে আজ যে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলো, তা ন্যায়বিচারের নতুন সূর্য উদিত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। আব্দুল হান্নান মোল্লার সেই আর্তনাদ কি বিচারক আর আইনি কাঠামো শুনতে পাবে? পুরো দেশ এখন সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।