প্রকাশ: ২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মিরপুরে চাঞ্চল্যকর শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম ঘিরে মঙ্গলবার ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে নেমে আসে শোকের এক গভীর ছায়া। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা নির্মম আসামিদের সামনে রেখে নিহত শিশু রামিসার মা পারভীন আক্তারের আর্তনাদ উপস্থিত সবার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ঘাতক সোহেল রানাকে দেখিয়ে তিনি যখন বলেন, ‘হত্যাও ও করেছে, ধর্ষণও ও করেছে’, তখন আদালতের গম্ভীর পরিবেশেও নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। মাতৃত্বের এই অসহায় আর্তি, ঘৃণা এবং খুনিদের নির্মমতার বিভীষিকা সাক্ষ্যগ্রহণের দিন উপস্থিত সবাইকে এক গভীর বিষাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে। এটি কেবল একটি বিচারিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এক মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ যা প্রতিটি মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
গত ১৯ মে সকালে মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং বাথরুমের ভেতরে লুকিয়ে রাখা খণ্ডিত মাথা উদ্ধারের ঘটনাটি সমগ্র জাতিকে স্তম্ভিত করেছিল। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবনের এই অকাল ও নৃশংস সমাপ্তি আমাদের সামাজিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তার চরম ঘাটতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। ঘটনার বিভীষিকা আজও মানুষের মনে ভয়ের সঞ্চার করে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এগিয়ে চলছে। মঙ্গলবার আদালতের বিচারক মাসরুর সালেকীনের সামনে দাঁড়িয়ে যখন পারভীন বেগম তার মেয়ের শেষ পরিণতির কথা বর্ণনা করছিলেন, তখন তার প্রতিটি বাক্যে ফুটে উঠছিল এক মায়ের অন্তহীন হাহাকার এবং ঘাতকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা। তিনি সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ঘটনার দিন আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে তিনি বাসায় নিজ কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তার দুই মেয়ের পার্শ্ববর্তী এক চাচার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা আসলেই সেখানে পৌঁছাতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। এর কিছুক্ষণ পরই রান্নাঘর থেকে হঠাৎ চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে। পারভীন বেগম ভেবেছিলেন, হয়তো পাশের ফ্ল্যাটের কোনো বাচ্চা চিৎকার করছে। কিন্তু রামিসা বাড়ি ফিরছে না দেখে তার অস্থিরতা বাড়তে থাকে। বড় মেয়ে রাইসা একা ফিরে এলে রামিসার খোঁজে তার অস্থিরতা উৎকণ্ঠায় রূপ নেয়।
আশপাশের প্রতিটি ঘরে, এমনকি নিচের অফিসের কাজ চলার স্থানেও রামিসাকে খুঁজে বেড়িয়েছেন তিনি। কোথাও তাকে না পেয়ে তিনি যখন আসামিদের ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়েন, তখন ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কিন্তু দরজার ঠিক সামনে মেয়ের স্যান্ডেলটি দেখে তার মনে এক অজানা আশঙ্কার উদয় হয়। তিনি বুঝতে পারেন, এখানেই তার প্রাণপ্রিয় সন্তানকে আটকে রাখা হয়েছে। তার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। তারা বারবার দরজা খোলার আকুতি জানালেও ভেতর থেকে স্বপ্না নামের ওই নারী দরজা খোলেননি। পরে উপস্থিত সবাই মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেই মুহূর্তের ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে পারভীন বেগম জানান, তারা যখন বেডরুমের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন, তখন বাথরুমে প্রচুর রক্ত দেখতে পান। সেই রক্তমাখা দৃশ্যের মাঝেই তিনি রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান। এক মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে। তিনি স্বপ্নাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি বারবার দরজা খোলার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু স্বপ্না সেই অনুরোধ রাখেনি। তিনি পরে জানতে পারেন যে, সোহেল রানা ওই সময় ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে পালিয়ে গিয়েছিল। পারভীন বেগমের বর্ণনায় সেই দিনের ভয়াবহতা এমনভাবে উঠে আসে যেন আদালতের বিচারকসহ উপস্থিত সকলেই সেই আতঙ্কের সাক্ষী হয়ে ওঠেন।
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল রানাকে দেখানোর সময় পারভীন আক্তারের কণ্ঠস্বরে ছিল তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ। তিনি স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, সোহেল রানাই তার মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে। তার এই সরাসরি অভিযোগ মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুধুমাত্র রামিসার মা নন, এই মামলায় তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও বোন রাইসা আক্তারসহ মোট দশজন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লার কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার মেয়ের প্রতি করা নিষ্ঠুরতার বর্ণনা আদালত কক্ষের উপস্থিত সবাইকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। এই মামলার প্রতিটি সাক্ষী তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঘটনার দিনের লোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন। তদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসামিরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং ঠান্ডা মাথায় এই অপরাধ সংঘটিত করেছে।
এই মামলাকে ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও ছিল প্রশংসনীয়। ঘটনার পর পল্লবী থানায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ দ্রুততম সময়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে ২০ মে সোহেল রানা আদালতে ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও প্রদান করে। আদালতের এই কঠোর অবস্থান ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারকে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দিয়েছে। মঙ্গলবার সকাল পৌনে নয়টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে এবং কাশিমপুর কারাগার থেকে তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে আদালতে আনা হয়। আসামিদের উপস্থিতিতেই মামলার বাদীর পক্ষ থেকে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে আসে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। খুনিরা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় অপরাধ সংঘটিত করে এবং তথ্য-প্রমাণ লোপাটের জন্য মরদেহের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে বাথরুমে লুকিয়ে রাখে।
শিশুনীতি ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করে সংঘটিত এই ঘটনাটি সমাজের অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। একজন নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের পর এভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল। এখন বিচারিক আদালতের রায়ের অপেক্ষায় পুরো দেশ। রামিসার মা পারভীন আক্তারের সেই শেষ আর্তনাদ আর বিচার চেয়ে আকুতি যেন আমাদের আইন ব্যবস্থাকে এই হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দিকেই পরিচালিত করে। সমাজ আজ প্রশ্ন করছে, কেন এত নৃশংসতা? কেন শিশুদের নিরাপত্তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ? আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা পারভীন বেগমের অশ্রুভেজা চোখ আজ কেবল তার মেয়ের ন্যায়বিচার নয়, বরং প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইছে। এটি কোনো সাধারণ মামলা নয়, এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুকে এমন নৃশংসতার শিকার হতে না হয়। দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন করে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল রামিসার আত্মা শান্তি পাবে এবং এই ধরণের অপরাধী চক্রের জন্য একটি কঠোর বার্তা পৌঁছাবে। আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলার বাকি সাক্ষীদের জবানবন্দিও অতি দ্রুত শেষ করার প্রক্রিয়া চলছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে এই মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে। রামিসার পরিবার এখন কেবল একটি প্রত্যাশা নিয়ে আদালতের দিকে তাকিয়ে আছে, আর তা হলো খুনিদের উপযুক্ত শাস্তি। ন্যায়বিচারের এই প্রতীক্ষা দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু সত্যের জয় যে অনিবার্য, তা আজ আদালতের কার্যক্রমে আবারও প্রমাণিত হলো।