সর্বশেষ :

প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদের চিরবিদায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ২৭ বার
প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদের চিরবিদায়

প্রকাশ: ০২ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সেই অগ্নিপুরুষ, রাজপথের লড়াকু ছাত্রনেতা এবং দীর্ঘকালীন সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞ কাণ্ডারি তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা ও পক্ষাঘাতের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন এক অস্থির সময়ের সাক্ষী এবং স্বাধীনতার সোপান তৈরিতে অন্যতম একজন কারিগর। দীর্ঘ অসুস্থতায় জনজীবন থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন থাকলেও, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

তোফায়েল আহমেদের উত্থান ছিল এক মহাকাব্যিক গল্পের মতো। ১৯৬৯ সালে যখন আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনে পাকিস্তান সরকার নিষ্পেষিত করছিল পূর্ব পাকিস্তানকে, তখন তোফায়েল আহমেদ ছাত্রসমাজের হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র এবং ডাকসুর ভিপি হিসেবে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বৈরাচার পতনের একেকটি মাইলফলক। সে সময়কার ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে তিনি যখন গর্জে উঠতেন, রাজপথে হাজারো ছাত্র-জনতা তাঁর পেছনে ছুটে চলত। সেই সময়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। অনেকেই মনে করেন, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরেই বাংলার মানুষের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আস্থার নাম ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৬৯ সালের গণ–আন্দোলন তাঁর নেতৃত্বেই পূর্ণতা পায়, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।

১৯৭০ সালের উত্তাল দিনগুলোতে তোফায়েল আহমেদের সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়। ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে তিনি আ স ম আবদুর রবের সাথে মিলে সংগঠনের হাল ধরেছিলেন। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে স্বাধীনতার প্রস্তুতির লক্ষ্যে যে ‘নিউক্লিয়াস’ গঠিত হয়েছিল, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সেই গোপন সাংগঠনিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি কেবল তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন না, ছিলেন মাঠের যোদ্ধা। যখনই স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তোফায়েল আহমেদ সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে বাঙালির ভাগ্য যখন অনিশ্চিত, তখন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করে ভারতে প্রেরণ এবং পরবর্তীতে ঐতিহাসিক ‘মুজিব বাহিনী’ গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্ব পালনকারী তোফায়েল আহমেদ সেই দিনগুলোতে এক লড়াকু সেনাপতির ভূমিকা পালন করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর তোফায়েল আহমেদের রাজনীতির মোড় ঘোরে ক্ষমতার বৃত্তে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে তার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেন। এই সময়টা তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও একই সাথে বিতর্কিত অধ্যায়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের পুনর্গঠনে সরকারের নেওয়া নানা বিতর্কিত পদক্ষেপের সঙ্গে তাঁর নামও জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রক্ষীবাহিনীর দায়বদ্ধতা ও কার্যক্রম নিয়ে যে সমালোচনা হয়েছিল, তাতে তাঁর নামও উচ্চারিত হয়। যদিও পরবর্তী জীবনে তিনি বারবার দাবি করেছেন যে, রক্ষীবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ সরাসরি তাঁর হাতে ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় সেই ক্ষতচিহ্ন মুছে যায়নি। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রাষ্ট্রের কঠিন সময়ে তিনি অভিভাবকের মতো বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কালরাত্রি নেমে আসে, তোফায়েল আহমেদকেও তার সাক্ষী হতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যার পর তাকেও গ্রেফতার করা হয় এবং অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বছরের পর বছর কারাবন্দী থেকে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন, তা তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি পুনরায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, দলের ভেতরে ক্ষমতার বিন্যাস পরিবর্তনের সাথে সাথে তাঁর অবস্থানও নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। শেখ হাসিনা যখন দলের হাল ধরেন, তখন তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাঁর কথিত ‘নিষ্ক্রিয়তা’ নিয়ে দলের ভেতর নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলেছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় তোফায়েল আহমেদ আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। তৎকালীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দলের ভেতরে যে ‘সংস্কারপন্থী’ অংশ সক্রিয় হয়েছিল, তাদের সাথে তোফায়েল আহমেদের যোগসাজশ নিয়ে দলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। যদিও সেই সংস্কার উদ্যোগ সফল হয়নি, কিন্তু এর প্রভাব তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে গভীর ক্ষত তৈরি করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর সংস্কারপন্থী নেতারা ক্ষমতার বলয়ের প্রান্তিক অবস্থানে চলে যান। তোফায়েল আহমেদও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদা পেলেও, প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে তিনি দূরেই ছিলেন। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক নির্মম বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত নেতৃত্বের সাথে পারিবারিক উত্তরাধিকারের নেতৃত্বের একধরনের নীরব টানাপোড়েন সবসময় বিদ্যমান থাকে।

তোফায়েল আহমেদের জীবন ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। উত্থান, পতন, আবেগ, ক্ষোভ এবং ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে ঘেরা তাঁর জীবন। তিনি ছিলেন সেই সময়ের নেতা, যখন রাজনীতি মানে ছিল আদর্শের লড়াই। আজকের দিনে বসে যখন আমরা তাঁর বিদায়ের দিকে তাকাই, তখন দেখি তিনি ছিলেন এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি যারা দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখেছিল এবং সেই স্বপ্ন পূরণে নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিল। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে একজন কিংবদন্তি ছাত্রনেতা হিসেবেই মানুষ মনে রাখবে। তাঁর জীবনের সীমাবদ্ধতাগুলো রাজনৈতিক ইতিহাসের গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে, কিন্তু তাঁর অবদানকে অস্বীকার করার কোনো পথ নেই।

পরিশেষে বলা যায়, তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু কেবল একজন রাজনীতিকের বিদায় নয়, বরং একটি যুগের অবসান। তিনি এমন এক সময়ে বিদায় নিলেন, যখন দেশের রাজনীতি এক নতুন মোড় নিচ্ছে। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তিনি হয়তো ক্ষমতার শীর্ষে থেকে বিদায় নিতে পারেননি, কিন্তু তাঁর নাম ১৯৬৯-এর ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তরুণ প্রজন্ম তাঁর জীবনী থেকে শিখবে যে, রাজনীতিতে নেতৃত্ব অর্জনের পথটি কণ্টকাকীর্ণ, আর সেই পথে সফল হতে হলে আদর্শের পথে অটল থাকা জরুরি। তাঁর স্মৃতি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে, বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, তোফায়েল আহমেদ ততদিন বেঁচে থাকবেন গণ–আন্দোলনের সেই অমর নায়ক হিসেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত