সর্বশেষ :

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামীকাল : বাড়বে ২০ শতাংশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ১০ বার
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামীকাল : বাড়বে ২০ শতাংশ

প্রকাশ: ২ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বড় সংবাদের অপেক্ষা করছে সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে বিদ্যুতের দাম পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি আজ বুধবার বিকেল ৩টায় এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই নতুন মূল্যহার ঘোষণা করবে। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অস্থিরতার মাঝে দাঁড়িয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের দিকে নজর ছিল ব্যবসায়ী, শিল্পমালিক এবং সাধারণ গৃহস্থালি গ্রাহকদের। সূত্র মতে, বিদ্যুতের দাম গড়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং নতুন এই বর্ধিত ট্যারিফ চলতি মাস জুন থেকেই কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।

মূল্যবৃদ্ধির এই ঘোষণা ঘিরে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে একটি স্বস্তির বার্তা দেওয়া হয়েছে। নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের নিরাপত্তার স্বার্থে ‘লাইফ লাইন’ বা বিশেষ ক্যাটাগরির গ্রাহকদের জন্য আপাতত কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। অর্থাৎ, যারা মাসে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের বিদ্যুৎ বিল আগের নিয়মেই নির্ধারিত থাকবে। সরকারের এই উদ্যোগটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে এসেছে। তবে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ওপর যে বাড়তি চাপ পড়তে যাচ্ছে, তা বিইআরসির খসড়া পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয়েছে।

এই মূল্য সমন্বয়ের নেপথ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বা আইএমএফ-এর কিছু শর্তাবলি। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে ভর্তুকির চাপ কমাতে আইএমএফ বাংলাদেশকে বেশ কিছু সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ মন্ত্রিসভা কমিটি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। এই সুপারিশের ভিত্তিতেই বিইআরসির মাধ্যমে স্বচ্ছ ও আইনি প্রক্রিয়ায় দাম নির্ধারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকেও দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দীর্ঘসময় ধরে বিবেচনার টেবিলে ছিল।

গত ২০ ও ২১ এপ্রিল বিইআরসি আয়োজিত দুই দিনব্যাপী গণশুনানিতে দেশের ছয়টি প্রধান বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি—পিডিবি, আরইবি, ডিপিডিসি, ডেসকো, ওজোপাডিকো এবং নেসকো তাদের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিল। কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়। গ্রাহক পর্যায়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগের বিষয়টি মাথায় রেখে বিইআরসির কারিগরি কমিটি একটি মধ্যমপন্থা অবলম্বনের সুপারিশ করে। তাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বিতরণ কোম্পানিগুলোর জন্য গড়ে প্রতি ইউনিট ১ টাকা ২৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানো যৌক্তিক হতে পারে। কমিশন চূড়ান্ত ঘোষণায় এই সুপারিশের কাছাকাছি কোনো সিদ্ধান্তেই পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিইআরসির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ব্যবহারকারী ইউনিটের ওপর ভিত্তি করে বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত যারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম রাখা হচ্ছে। তবে ব্যবহারের পরিমাণ যত বৃদ্ধি পাবে, প্রতি ইউনিটের দামের হার তত বেশি হারে কার্যকর হবে। বিশেষ করে ৪০০ ইউনিট থেকে শুরু করে ৬০০ ইউনিট এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির হার হবে সর্বোচ্চ। এটি মূলত বিলাসদ্রব্য ব্যবহারকারী বা বড় শিল্প গ্রাহকদের ওপর ভর্তুকির চাপ কমানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়ে। ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই আশঙ্কা করছেন যে, বিদ্যুতের বাড়তি দাম উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় এবং নিয়মিত নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে এই মূল্য সমন্বয় এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। জুন মাসের শুরুতেই এই নতুন মূল্যহার কার্যকর হলে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কেমন প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিদ্যুৎ খাতের আধুনিকায়ন এবং জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার যে বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্তকে দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল।

পরিশেষে বলা যায়, বিইআরসির আজকের ঘোষণার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান হতে যাচ্ছে। সাধারণ গ্রাহক হিসেবে এখন প্রত্যাশা থাকবে, দাম বাড়ার পর বিদ্যুতের মানের উন্নয়ন যেন নিশ্চিত করা হয়। লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি এবং আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুফল যদি গ্রাহক পান, তবেই এই বাড়তি মূল্যবৃদ্ধির তিক্ততা কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠবে। সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এই নতুন মূল্যকাঠামোকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা এবং বিদ্যুতের অপচয় রোধে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা বজায় রাখা। জুন মাস থেকে শুরু হওয়া এই নতুন যাত্রায় বিদ্যুৎ বিভাগ কতটা সফল হয়, তা জানতে এখন দেশের মানুষের চোখ বিইআরসির সংবাদ সম্মেলনের দিকেই নিবদ্ধ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত