ঋণের বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে দেশের উন্নয়ন বাজেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ১৮ বার
ঋণের বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে দেশের উন্নয়ন বাজেট

প্রকাশ: ০৩ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি। প্রতি বছর সরকারের উন্নয়ন বাজেট ঘিরে সাধারণ মানুষের অনেক স্বপ্ন থাকে, যেখানে আশা করা হয় দেশের অবকাঠামো, যোগাযোগ ও সামাজিক খাতে উন্নয়নের জোয়ার আসবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়ন বাজেটের বিশাল অংশ জুড়ে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের যে ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা এখন অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত পাঁচ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশীয় সম্পদের ব্যবহারের হার ক্রমান্বয়ে কমছে এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এই ঋণের বেড়াজাল কেবল বাজেটের আকারকেই প্রভাবিত করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির ওপর ঋণের বোঝা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে।

চলতি এবং আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা ও সংশোধিত তথ্যের দিকে তাকালে সরকারের এই ঋণনির্ভরতার প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত উন্নয়ন বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এই বিশাল বাজেটের একটি বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩৭ শতাংশই মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের মাধ্যমে। বৈদেশিক সহায়তা ছাড়া দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা এখন সরকারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি তহবিলের সীমাবদ্ধতা এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি মূলত এই সংকটের প্রধান কারণ। অন্যদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সময়মতো পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যর্থতা এবং প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বৃদ্ধির ফলে খরচ যে হারে বাড়ছে, তা জাতীয় অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন বাজেটে এই ঋণনির্ভরতা এক ধরনের দুষ্টচক্রের সৃষ্টি করেছে। যখন প্রত্যাশিত বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান সময়মতো পাওয়া যায় না, তখন সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন প্রকল্পের কাজের গতি কমে যায়, অন্যদিকে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে বছরের শুরুতে যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বছরের শেষে দেখা যায় তার বড় একটি অংশ অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। গত কয়েক বছরের সংশোধিত বাজেটগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবারই মূল এডিপির আকার কাটছাঁট করতে হয়েছে, যার ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কাঙ্ক্ষিত সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে এডিপিতে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের হার ছিল ৩০ দশমিক ১০ শতাংশ। অথচ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশে। এই ধারাবাহিকভাবে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা নির্দেশ করে যে, অভ্যন্তরীণ সম্পদের আহরণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে পারছে না। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ সম্পদের ব্যবহারের হার ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রায় ৭০ শতাংশ থেকে কমে এখন ৬৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বুঝিয়ে দেয় যে, দেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের যে সক্ষমতা অর্জন করার কথা ছিল, তা থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহ ও রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আমাদের প্রতিবেশী সমমানের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। ফলে সরকার উন্নয়ন কাজের জন্য বিদেশি ঋণের দিকে হাত বাড়াতে বাধ্য হয়। এই ঋণ যখন চড়া সুদে দীর্ঘমেয়াদী কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয়, তখন তা জাতীয় বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে এই ঋণের ফাঁদ থেকে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কেবল মেগা প্রকল্প গ্রহণ করলেই চলবে না, বরং সেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই থেকে শুরু করে কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, প্রকল্পের নাম পরিবর্তন, মেয়াদ বাড়ানো এবং অযৌক্তিক ব্যয়ের কারণে ঋণের বোঝা বেড়ে যায়। এই ধরনের অপচয় রোধ করতে পারলে নিজস্ব অর্থায়নে ছোট ও মাঝারি মানের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো। এছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মাধ্যমেও সরকারি অর্থের ওপর চাপ কমানো যেতে পারে।

দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে রাজস্ব ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। কর জালের বিস্তার ঘটানো, কর ফাঁকি রোধ করা এবং নিয়মিত কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের যে বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে। শুধুমাত্র বৈদেশিক সাহায্যের ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজালে তা দেশের সার্বভৌমত্বের ওপরও এক ধরনের নীরব চাপের সৃষ্টি করে। একটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এই ঋণনির্ভরতা বর্তমানে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, উন্নয়ন মানে কেবল বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ নয়, বরং সেই স্থাপনাগুলো কতটুকু টেকসই এবং তার পেছনে ঋণের বোঝা কতটুকু, তাও বিবেচ্য বিষয়। বর্তমান সরকার যদি এখন থেকেই রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় রোধ করতে পারে, তবেই এই ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। দেশের সাধারণ মানুষ চায় না তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঋণের বোঝায় পিষ্ট হোক। তাই যথাযথ পরিকল্পনা এবং দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলাই হোক আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ। বর্তমান অস্থিরতা কাটিয়ে উন্নত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যা ঋণনির্ভর নয় বরং আত্মনির্ভরশীলতাকে গুরুত্ব দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত