সর্বশেষ :
২০২৬ বিশ্বকাপে বড় পরিবর্তন, ফুটবল টুর্নামেন্টে নতুন যুগের ইঙ্গিত সোমালি রেফারিকে ঢুকতে না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনায় ইয়ান রাইট ২০২৬ বিশ্বকাপ: গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কারা এগিয়ে? মিরসরাইয়ে নিখোঁজ তিন কিশোর উদ্ধার, স্বস্তি ফিরেছে পরিবারে মেলান্দহে পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু চিরিরবন্দরে ৩ মাদকসেবীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারাদণ্ড ১০ হাজার টন মসুর ডাল কিনবে সরকার, বাজার স্থিতিশীলতায় উদ্যোগ প্রশাসনিক কাজে জবাবদিহি নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর মে মাসে বিজিবির অভিযানে ১৭৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ, সীমান্তে কড়াকড়ি জোরদার ৭৯ হাজার ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ নিয়ে নতুন বিতর্ক, যাচাই প্রক্রিয়া ঘিরে আলোচনা

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে নতুন বাজেটের রূপরেখা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ৩৩ বার
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে নতুন বাজেটের রূপরেখা

প্রকাশ:  ০৩ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসে এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের দর্শন ঘোষণা করেছেন। রাজধানীর অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরামের আয়োজনে এক সেমিনারে তিনি যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তা মূলত উন্নয়ন দর্শনকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়। সরকারের এই নতুন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ, যার মাধ্যমে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে তাদের জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা হবে। অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, গত কয়েক দশকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে অবহেলিত ও বঞ্চিত ছিলেন নিম্ন আয়ের মানুষ। সেই বঞ্চনার বৃত্ত ভেঙে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেটের মূল ফোকাস বা কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার জন্য সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

অর্থনীতির এই নতুন মডেলের নাম দেওয়া হয়েছে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ বা ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, জাতীয় জিডিপি কেবল বড় বড় শিল্পকারখানা বা মেগা প্রজেক্টের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সংস্কৃতি, ক্রীড়া, কারুশিল্প এবং প্রান্তিক মানুষের নিত্যদিনের সৃজনশীল কাজের প্রতিটি সূক্ষ্ম অংশই অর্থনীতিকে সচল রাখে। বিশেষ করে কামার, কুমার, তাঁতি এবং ক্ষুদ্র কারুশিল্পীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতি কর্মসূচি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে দক্ষতাবৃদ্ধি, সহজশর্তে ঋণ প্রদান, ডিজাইনের আধুনিকায়ন এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের জন্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো প্রতিটি ঘরের মানুষকে উন্নয়নের সুফলের অংশীদার করা, যাতে করে কোনো নাগরিকই দেশের অগ্রযাত্রায় পিছিয়ে না পড়ে।

বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপের বিন্দুমাত্র সুযোগ রাখা হয়নি। খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের মানোন্নয়নের জন্য প্রবর্তিত ‘ফার্মার্স কার্ড’ কৃষি খাতের ডিজিটাল রূপান্তরে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে জনগণের পকেট থেকে হওয়া অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। ইউনিভার্সাল ও প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সম্প্রসারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও এনজিওদের সমন্বিত উদ্যোগে একটি স্বাস্থ্যবান্ধব কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং দুটি আগের সরকারের রেখে যাওয়া জটিল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সরকার এই বাজেট প্রণয়ন করছে। অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজতর করার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি এমন এক ‘নিয়ন্ত্রণমুক্ত অর্থনীতি’ গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন যেখানে বিনিয়োগের বাধাগুলো দূর হবে এবং অনুমোদনের কাজগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা বিএসইসিকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। পেশাদার ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত নতুন কমিশন পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে এবং কোম্পানিগুলোকে সহজে তহবিল সংগ্রহে সহায়তা করবে। এই সংস্কারগুলো দেশের বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনেও নতুন আশার সঞ্চার করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা রুখতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ড্যাশবোর্ড ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সরকারি প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের গতিপ্রকৃতি এই ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে, যার ফলে কোনো প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত হলে তার দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এটি প্রশাসনের কর্মতৎপরতা এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার যে কঠোর সংস্কারের পথে হাঁটছে, তা ধাপে ধাপে দেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত ভিত্তি ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবে। বর্তমান এই বাজেট কেবল পরিসংখ্যানের খেলা নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জন্য একটি প্রতিশ্রুতি।

আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। বক্তারা অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় সরকারের এই সাহসী উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং সময়মতো বাজেট বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সঠিক মনিটরিং থাকলে এই বাজেট প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের উন্নয়ন তখনই প্রকৃত অর্থ পায় যখন তা সমাজের শেষ প্রান্তে থাকা মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। অর্থমন্ত্রীর এই বাজেট দর্শন যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও টেকসই হবে। উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ না থেকে যখন মানুষের ক্ষমতায়নে রূপান্তরিত হয়, তখনই তা প্রকৃত গণতন্ত্রীকরণের পথে এগিয়ে যায়। সরকার সেই কঠিন পথেই পা বাড়িয়েছে, যার সাফল্যের অপেক্ষায় পুরো জাতি তাকিয়ে আছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আসন্ন বাজেট যেন কেবল কাগজে-কলমে না থেকে বাস্তব জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত