রামিসা হত্যা: আদালতে সোহেল ও তার স্ত্রী, শুনানি আজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ৬৬ বার
রামিসা হত্যা: আদালতে সোহেল ও তার স্ত্রী, শুনানি আজ

প্রকাশ: ০৩ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর পল্লবী এলাকায় আট বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় সারা দেশে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের আবহে আজ বুধবার এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। আলোচিত এই বর্বরোচিত মামলার প্রধান দুই অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আজ বেলা ১১টায় এই আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই শুনানি উপলক্ষে সকাল থেকেই আদালত চত্বরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আসামিদের হাজতখানা থেকে আদালতে হাজির করার সময় উপস্থিত সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ লক্ষ্য করা গেছে।

আট বছরের শিশু রামিসা ছিল পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির একজন মেধাবী ছাত্রী। তার প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা শৈশব নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে এক অমানুষিক নরপিশাচের পাশবিকতা। গত ১৯ মে সকালে যখন পুরো রাজধানী তার আপন গতিতে চলছিল, তখন পল্লবীর একটি অ্যাপার্টমেন্টে ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক হত্যাকাণ্ড। রামিসার নিথর দেহ উদ্ধারের পর যে বিভীষিকাময় চিত্র প্রকাশ পায়, তা শিহরিত করে তুলেছিল পুরো দেশবাসীকে। সোহেল ও স্বপ্না দম্পতি ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট হিসেবে থাকতেন। তারা যে এতটা ভয়ানক ও হিংস্র হতে পারেন, তা কল্পনাও করতে পারেননি ওই ভবনের অন্য বাসিন্দারা।

মামলার নথিপত্র এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার দেওয়া অভিযোগপত্র অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আসামিরা অত্যন্ত কৌশলে তাকে প্রলুব্ধ করে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিশুটিকে স্কুলগামী অবস্থায় খুঁজে না পেয়ে তার মা পারভীন আক্তার দিশেহারা হয়ে পড়েন। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে সোহেল ও স্বপ্নার কক্ষের সামনে রামিসার জুতো দেখতে পান তার মা। সেই অশুভ সংকেত থেকে শুরু হয় এক বিভীষিকার শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যা দেখা যায়, তা কোনো মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। রামিসার মাথাবিহীন শরীর পড়ে ছিল মেঝেতে, আর তার কাটা মাথাটি রাখা ছিল বাথরুমের বালতির ভেতরে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান কর্তৃক আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিট অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল পরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর। স্বপ্নাকে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বপ্না স্বীকার করেন যে, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে সোহেল তাকে ধর্ষণ করে এবং নির্মমভাবে হত্যা করে। লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে মাথাটি ছুরি দিয়ে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, শিশুটির দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ-বিচ্ছিন্ন করে মরদেহটি শোবার ঘরের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এই চরম বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড শেষে সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যদিও পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তারা ধরা পড়ে।

এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ শুরু থেকেই অত্যন্ত তৎপর। গত ১ জুন ট্রাইব্যুনাল সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন করেন। তাদের বিরুদ্ধে শিশু ধর্ষণ, পরিকল্পিত হত্যা এবং আলামত বা মরদেহ গুম করার মতো জঘন্য অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এই মামলায় টানা ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। আদালতে ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তারের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল বিচারকক্ষ। সাক্ষীদের বর্ণনা থেকে বেরিয়ে এসেছে ঘটনার প্রতিটি লোমহর্ষক অধ্যায়, যা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তুলেছিল।

আজকের শুনানিতে আসামিরা আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করার সুযোগ পাবেন। তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনার আলামত, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং আসামিদের স্বীকারোক্তি এই হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতাকে এতটাই স্পষ্ট করেছে যে, তাদের নির্দোষ দাবি করার পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ। আত্মপক্ষ সমর্থনের এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করবেন। এরপরই হয়তো চূড়ান্ত রায়ের দিকে এগিয়ে যাবে দেশের অন্যতম চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি।

রামিসার পরিবারসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের একটাই দাবি—এই পিশাচদের সর্বোচ্চ শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। কোনো আইনি মারপ্যাঁচে যাতে এই অপরাধীরা পার পেয়ে না যায়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন ভিকটিমের বাবা-মা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্র যে দ্রুত ও কঠোর বিচারের মাধ্যমে রামিসার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে বদ্ধপরিকর, তা আজকের আদালতের কার্যক্রমের মাধ্যমেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করছে সচেতন সমাজ।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন বরাবরই শিশুদের নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। রামিসার এই করুণ মৃত্যু আমাদের সমাজ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক ব্যর্থতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। সাবলেট ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং অপরিচিত প্রতিবেশীদের সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। আজকের এই শুনানি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি মাইলফলক যা ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে রামিসার পরিবারকে অনেকটা স্বস্তি দেবে। আমরা চাই, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলার রায় কার্যকর হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুকে এমন নিষ্ঠুরতার বলি হতে না হয়। পুরো দেশ আজ তাকিয়ে আছে আদালতের রায়ের দিকে, যেখানে রামিসার আত্মা হয়তো বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com