আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় ইসলামের অমোঘ নির্দেশনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ৩৫ বার
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় ইসলামের অমোঘ নির্দেশনা

প্রকাশ: ০৩ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসলামী শরিয়তে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা কেবল সামাজিক শিষ্টাচার বা মানবিক গুণাবলি নয়, বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। পবিত্র কোরআন এবং মহানবী (সা.)-এর পবিত্র হাদিসের পাতায় পাতায় আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করার গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এই সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ইসলামে কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস এই বিষয়ের গাম্ভীর্যকে আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ যখন সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করলেন, তখন ‘রেহেম’ বা আত্মীয়তার বন্ধন সরাসরি আল্লাহর আরশের কাছে দাঁড়িয়ে আর্জি পেশ করেছিল। সেই আরজিতে সে বলেছিল, হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই যেন দুনিয়াতে আমাকে কেউ বিচ্ছিন্ন না করে। এর উত্তরে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে, আল্লাহ নিজেও তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবেন। আর যে ব্যক্তি এই পবিত্র বন্ধন ছিন্ন করবে, আল্লাহও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবেন।

এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। আল্লাহ তাআলার এই বিশেষ অঙ্গীকার প্রমাণ করে যে, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার একটি সরাসরি কারণ। পবিত্র কোরআনের সুরা মুহাম্মাদের বাইশ ও তেইশ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যারা দুনিয়ায় ক্ষমতা বা পার্থিব মোহে মত্ত হয়ে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের আল্লাহ অভিশপ্ত করেন এবং তাদের অন্তরের চোখ ও কান বন্ধ করে দেন। এই ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করলে যেকোনো মুমিন মুসলমানের হৃদয়ে ভয়ের শিহরণ জাগা স্বাভাবিক। আত্মীয়তার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা শুধু রক্তের সম্পর্কের দাবি নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি আমানত, যা রক্ষা করা প্রত্যেক মুমিনের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার প্রভাব কেবল পরকালেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দুনিয়ার জীবনেও এর সুফল অপরিসীম। হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, যে ব্যক্তি আত্মীয়দের খোঁজখবর নেয়, তাদের দুঃখে-সুখে পাশে দাঁড়ায় এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করে, আল্লাহ তার জীবনে বিশেষ রহমত ও বরকত বর্ষণ করেন। অনেক সময় দেখা যায়, আত্মীয়দের মধ্যে তুচ্ছ কোনো ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যা পরবর্তীতে বিদ্বেষ ও হিংসার রূপ নেয়। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, সম্পর্ক রক্ষায় কেবল তারাই উদ্যোগ নেবে না যাদের সাথে সম্পর্ক ভালো, বরং যারা সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়, তাদের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এই একতরফা উদ্যোগ বা ধৈর্যশীলতা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়।

আমাদের সমাজে বর্তমানে পারিবারিক ও আত্মীয়তার বন্ধনগুলো দিন দিন শিথিল হয়ে পড়ছে। আধুনিক ব্যস্ততা এবং যান্ত্রিক জীবনযাত্রার ফলে মানুষ তার রক্তের সম্পর্কের মানুষদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা সমাজে অশান্তি, হিংসা ও ফিতনা সৃষ্টির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার হলো সমাজের ভিত্তি, আর আত্মীয়তা হলো সেই ভিত্তির মজবুত রশি। যখন এই রশি ছিঁড়ে যায়, তখন পুরো সমাজ কাঠামোই ধসে পড়তে থাকে। ইসলাম পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে একে অপরের প্রতি দয়ালু হওয়ার এবং পারস্পরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সালাম, কুশল বিনিময়, উপহার আদান-প্রদান এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো হলো আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার সহজতম মাধ্যম।

ইসলামের এই অমীয় বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্যরা নিরাপদ থাকে এবং যে আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ করে। আত্মীয়দের অধিকার কেবল তাদের সাথে দেখা করা বা মিষ্টিমুখ করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের প্রয়োজন বুঝতে পারা এবং সাধ্যমতো তা পূরণের চেষ্টা করাও এই সম্পর্কের দাবি। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ধনী আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে পছন্দ করি, কিন্তু দরিদ্র বা অসহায় আত্মীয়দের এড়িয়ে চলি। অথচ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সেই আত্মীয়কে, যে সবচেয়ে বেশি অভাবী বা যার সাথে সম্পর্কের দূরত্ব সবচেয়ে বেশি। মহানবী (সা.)-এর জীবনী থেকে আমরা পাই যে, তিনি নিজের ঘোর শত্রুদের সাথেও আত্মীয়তার খাতিরে পরম সহনশীলতা ও মহানুভবতা প্রদর্শন করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম সহজ রাস্তা। আমরা যদি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আত্মীয়দের প্রতি সদয় হতে পারি, তাদের ভুলগুলো ক্ষমা করার উদারতা দেখাতে পারি এবং সম্পর্কের মানদণ্ড হিসেবে দুনিয়াবি লাভের পরিবর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেই, তবেই সমাজ থেকে অশান্তি ও বিভেদ দূর করা সম্ভব। একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে প্রতিটি পরিবারকে নিজের জায়গা থেকে আত্মীয়তার বন্ধন পুনর্গঠনের অঙ্গীকার করতে হবে। এটি কেবল একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হওয়ার সর্বোত্তম পথ। আসুন, আমরা আজ থেকেই আমাদের আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নতুন করে শপথ নেই, তাদের খোঁজখবর নেই এবং সম্পর্কের এই পবিত্র বন্ধনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আজীবন অক্ষুণ্ণ রাখি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত