হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ১০ বার
হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা

প্রকাশ: ০৩ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো কৃষি, আর সেই কৃষির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হাওর অঞ্চল। প্রকৃতি ও ভূ-প্রকৃতির বৈচিত্র্যে ঘেরা এই হাওরগুলো প্রতি বছর ফসলের প্রাচুর্যে ভরিয়ে তোলে দেশের খাদ্যভাণ্ডার। কিন্তু এবারের অকাল অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল হাওর জনপদের মানুষের স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। চোখের সামনে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকরা। এমন দুর্যোগের মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে ও তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক জরুরি ও বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য একটি বিশেষ সার্কুলার জারি করা হয়েছে, যেখানে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ বিতরণের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিশেষ নির্দেশনায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের হাওর এলাকার কৃষকদের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সার্কুলারে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও ঢলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকরা যেন কোনোভাবেই ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন। ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী যাদের স্মার্ট কার্ড রয়েছে, তারা এই ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। পাশাপাশি, যাদের ১০ টাকার বিশেষ ব্যাংক হিসাব রয়েছে, সেইসব প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকও এই বিশেষ ঋণ সুবিধার আওতায় আসবেন। কৃষকদের সহায়তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

দুর্যোগের ভয়াবহতা কতটা প্রকট, তা অনুধাবন করা যায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে। হাওর অধ্যুষিত সাতটি জেলায় প্রায় ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টর আবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যা ওই অঞ্চলের মোট আবাদি জমির ১০ শতাংশেরও বেশি। স্থানীয় কৃষকদের দেওয়া তথ্য মতে, ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি। তাদের দাবি অনুযায়ী, হাওরের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। বেসরকারি হিসাবে হাওর এলাকায় প্রায় এক লাখ ১২ হাজারেরও বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে নেত্রকোনায় ৭৮ হাজার, কিশোরগঞ্জে ৫২ হাজার ৫০০ এবং সুনামগঞ্জে ৬০ হাজারের বেশি কৃষি পরিবার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এসব কৃষকের অনেকেই আগামীর ফসল ফলানোর জন্য ঋণ বা পুঁজির সংস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সার্কুলার কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি দুর্গত কৃষকদের জন্য একটি বড় ভরসা। ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কৃষকের স্মার্ট কার্ড থাকুক বা না থাকুক, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন তাদের সহায়তায় বাধা না পান। ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জটিলতা কমিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকতে বলা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন চক্র সচল রাখতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটাতে এই ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এই বিশেষ কার্যক্রমটি সফলভাবে সম্পন্ন করেন।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, হাওরের এই কৃষকরা প্রতি বছর অকাল বন্যার অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে ধান চাষ করেন। তাদের অদম্য মানসিকতার কারণেই বাংলাদেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে। যখনই প্রকৃতি বিরূপ আচরণ করে, তখনই কৃষকের স্বপ্নগুলো তলিয়ে যায় পানির অতলে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ নিশ্চিতভাবেই কৃষকদের মনে কিছুটা হলেও সাহস জোগাবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো যদি মাঠ পর্যায়ে স্বচ্ছতা বজায় রেখে এই ঋণ বিতরণ করতে পারে, তবেই এর সুফল সাধারণ কৃষকের হাতে পৌঁছাবে।

এই দুর্যোগ কেবল ফসলের ক্ষতি করেনি, বরং হাজার হাজার কৃষকের পরিবারকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। বোরো ধান তাদের বছরের একমাত্র সম্বল। সেই সম্বল হারিয়ে তারা এখন ঋণের বোঝায় পিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকঋণ ছাড়া তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর আর কোনো উপায় নেই। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংককে তাদের শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিতে হবে যেন তারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করেন এবং কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়া ঋণ প্রদান নিশ্চিত করেন। সহজ শর্তে এই ঋণ তাদের পুনরায় বীজতলা তৈরি ও পরবর্তী মৌসুমের ফসলের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করবে।

পরিশেষে বলা যায়, হাওরের কৃষি শুধু একটি অঞ্চল নয়, এটি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উৎস। এই খাতের সংকট মানেই পুরো দেশের খাদ্যের যোগান নিয়ে দুশ্চিন্তা। দুর্যোগ পরবর্তী এই দুঃসময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত এই বিশেষ পদক্ষেপ সরকারের কৃষি বান্ধব নীতিরই প্রতিফলন। আমরা আশা করি, ব্যাংকগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াবে। এই ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া যদি দুর্নীতিমুক্ত ও সহজসাধ্য হয়, তবেই কৃষক আবার নতুন উদ্যমে মাঠে নামতে পারবেন। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই বিশেষ উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং আশা করে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাওরের প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের হাতে এই ঋণের সুবিধা পৌঁছে যাবে, যাতে করে তারা পুনরায় তাদের সোনালী ফসলের স্বপ্ন দেখতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত