প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকা, যা ক্রমাগত বিশ্বের অন্যতম মেগাসিটিতে পরিণত হচ্ছে, তার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। যত্রতত্র ময়লা পড়ে থাকা, সঠিক সময়ে বর্জ্য অপসারণ না হওয়া এবং ড্রেন ও রাস্তাঘাটে আবর্জনার স্তূপ—এসব কিছু মিলিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ঢাকা তার প্রাণশক্তি ও সৌন্দর্য হারাচ্ছিল। তবে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘবে এবার নতুন পথচলা শুরু হতে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য এক নতুন ও সময়োপযোগী নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এখন থেকে দিনের আলোয় দুই শিফটে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মাধ্যমে নগরীর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সরকারের এই কঠোর অবস্থান নগরবাসীকে এক পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য ঢাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
বুধবার মন্ত্রণালয়ের সিটি কর্পোরেশন-১ শাখা থেকে উপ-সচিব মো. রবিউল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক জরুরি চিঠিতে এই সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহানগরীর যাবতীয় ময়লা ও বর্জ্য যথাসময়ে অপসারণ করা কেবল দায়িত্ব নয়, এটি নগরবাসীর মৌলিক অধিকার। ঢাকা মহানগরীতে দিনের বেলায় জনসাধারণের ব্যাপক সমাগম ঘটে, এই ব্যস্ত সময়ে বর্জ্য স্তূপ হয়ে পড়ে থাকলে যেমন পরিবেশ দূষণ হয়, তেমনি জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। তাই অধিকতর পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দিনের বেলায় দুই শিফটে পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ সচেতন নাগরিকরা।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি নগরীর সভ্যতার মাপকাঠি। যে শহর যত বেশি পরিষ্কার, সে শহর তত বেশি আধুনিক। ঢাকার মতো জনবহুল শহরের অলিগলিতে দিনের বেশিরভাগ সময় ময়লার ভ্যান বা আবর্জনার স্তূপ পথচারীদের চলাচলের চরম ব্যাঘাত ঘটায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই ময়লা বৃষ্টির পানিতে মিশে ড্রেনে গিয়ে শহরের নর্দমাগুলো অচল করে দেয়, যার ফলে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। সরকারের নতুন এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে দিনে দুইবার বর্জ্য সংগ্রহের ফলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ময়লার পাহাড় আর দেখা যাবে না। এটি একদিকে যেমন শহরের দৃশ্যপট বদলে দেবে, অন্যদিকে ডেঙ্গু বা অন্যান্য পানিবাহিত রোগের বিস্তার রোধেও দারুণ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।
সিটি করপোরেশনের জন্য এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও, এটি অসম্ভব নয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এই চিঠিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ আশা করছে, এই কার্যক্রম সফল হলে নগরবাসী এক নতুন ঢাকার অভিজ্ঞতা পাবে। শুধু ময়লা অপসারণ নয়, বরং বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং ডাম্পিং স্টেশন পর্যন্ত তা দ্রুত পৌঁছানোর যে লজিস্টিক সহায়তা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করার জন্য দুই সিটি করপোরেশনকে এখন থেকেই পরিকল্পনা সাজাতে হবে। জনবল নিয়োগ এবং শিফটিং ডিউটির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কর্মঘণ্টা এমনভাবে সমন্বয় করতে হবে যাতে করে নগরীর কোনো এলাকা পরিষ্কারের বাইরে না থাকে।
ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিকট এই চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে, যাতে তারা গুরুত্বের সাথে বিষয়টি দেখেন। নগরবাসীর প্রত্যাশা, এই নির্দেশ যেন কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। অতীতেও অনেক সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সঠিক তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে সেগুলোর সুফল মানুষ খুব একটা পায়নি। তবে বর্তমান সময়ে ডিজিটাল মনিটরিং এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকায় এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেকাংশেই বেশি। সিটি করপোরেশনগুলো যদি নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ওয়ার্ডে বর্জ্য অপসারণের মান এবং সময় মনিটরিং করতে পারে, তবে এই উদ্যোগটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে নগরবাসীর সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। দিনের দুইবার বর্জ্য সংগ্রহ করার সুবিধা পেতে হলে নগরবাসীকেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের ময়লা নির্ধারিত স্থানে বা নির্ধারিত ভ্যানে জমা দিতে হবে। রাস্তার ওপর বা ড্রেনে ময়লা ফেলার যে অভ্যাস ঢাকাবাসীর একাংশের মধ্যে রয়েছে, তা বর্জ্য অপসারণের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে। তাই সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থানীয় প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। যখন একজন নাগরিক দেখবেন তার রাস্তাটি দিনের বেশিরভাগ সময় পরিষ্কার থাকছে, তখন তিনিও নিজ উদ্যোগে শহরকে পরিষ্কার রাখতে অনুপ্রাণিত হবেন। এটি একটি পারস্পরিক সম্পর্কের জায়গা, যেখানে সেবা প্রদানের পাশাপাশি সেবা গ্রহীতার দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, ঢাকার পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে এটি একটি সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আমরা যদি সত্যি ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরী হিসেবে বিশ্বে উপস্থাপন করতে চাই, তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ অপরিহার্য। দুই সিটি করপোরেশনের আন্তরিকতা, মন্ত্রণালয়ের কঠোর তদারকি এবং নাগরিকদের সচেতনতা—এই তিনের সমন্বয়ই পারে ঢাকা শহরকে আবর্জনামুক্ত রাখতে। আমরা আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। সরকারের এই নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আজ পুরো ঢাকা মহানগরী, যেখানে বাতাসের প্রতিটি নিঃশ্বাসে থাকবে নির্মলতা ও স্বচ্ছতার ছোঁয়া।