প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। বিশ্ব রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে নতুন পাঁচ দেশের অন্তর্ভুক্তি এক নতুন মেরুকরণের বার্তা নিয়ে এসেছে। বুধবার (৩ জুন) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গোপন ভোটাভুটির মাধ্যমে আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে শুরু হতে যাওয়া দুই বছর মেয়াদের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে অস্ট্রিয়া, কিরগিজস্তান, পর্তুগাল, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং জিম্বাবুয়ে। বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য দেশের ভোটে নির্বাচিত এই দেশগুলো পরবর্তী দুই বছর বৈশ্বিক সংকটের সমাধানে ও যুদ্ধের উত্তাপ প্রশমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি নতুন ভারসাম্য ফুটে উঠেছে।
নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে পাঁচটি দেশ স্থায়ী এবং বাকি ১০টি দেশ অস্থায়ী হিসেবে প্রতি বছর পাঁচটির করে পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। এবার নির্বাচনে ইউরোপীয় অঞ্চলে জার্মানির মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রকে হারিয়ে অস্ট্রিয়া ও পর্তুগালের বিজয় বিশ্ব রাজনীতিতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জার্মানির মতো বড় রাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে এই দুই দেশের জয় বিশ্বমঞ্চে মধ্যম সারির দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের পরিচয় দেয়। অন্যদিকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ফিলিপাইনের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে কিরগিজস্তানের সদস্যপদ লাভ করা এই অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা করতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক এই ভোটাভুটির বাইরে জিম্বাবুয়ে ও ত্রিনিদাদ ও টোবাগো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সদস্যপদ লাভ করেছে।
নির্বাচিত এই নতুন দেশগুলো পাকিস্তান, সোমালিয়া, পানামা, গ্রিস এবং ডেনমার্কের শূন্যস্থান পূরণ করবে। বিদায়ী সদস্যদের দায়িত্ব পালনকালে তারা বিভিন্ন বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে যে অবদান রেখেছিল, নতুন পাঁচ দেশের সামনে এখন তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা এক বড় দায়িত্ব। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চলমান সংকট নিরসনে নিরাপত্তা পরিষদের নতুন সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় এই দেশগুলো কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করে, সেদিকে তাকিয়ে থাকবে বিশ্ববাসী।
নিরাপত্তা পরিষদের এই নির্বাচনের ঠিক আগের দিনটি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলকের। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের সমন্বয়ে গঠিত সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। নিরাপত্তা পরিষদের এই নির্বাচনের পাশাপাশি সাধারণ পরিষদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের এমন অবস্থান বিশ্ব কূটনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকেই তুলে ধরে। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ঐতিহাসিক মেয়াদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি বিশ্বের নেতৃত্ব দেবেন এবং এই সময়কালে নিরাপত্তা পরিষদের নতুন নির্বাচিত এই সদস্য দেশগুলোর সাথে তার সমন্বয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন আশার সঞ্চার করবে।
নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে এই পাঁচ দেশের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি বৈশ্বিক দক্ষিণ বা গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধিতে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। জিম্বাবুয়ের মতো দেশের অন্তর্ভুক্তি আফ্রিকার কণ্ঠস্বরকে নিরাপত্তা পরিষদে আরও জোরালো করবে, তেমনি কিরগিজস্তানের মতো মধ্য এশিয়ার দেশের অংশগ্রহণ নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করবে। ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর নির্বাচন ক্যারিবীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বের অস্থির এই সময়ে যখন যুদ্ধ আর অর্থনৈতিক মন্দা মানবজাতিকে গ্রাস করছে, তখন নিরাপত্তা পরিষদের এই পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে আছে কোটি মানুষ। মানুষ চায় এমন একটি নিরাপত্তা পরিষদ, যারা কোনো বিশেষ দেশের স্বার্থরক্ষার চেয়ে বরং বিশ্বশান্তিকে প্রাধান্য দেবে। দীর্ঘ কয়েক দশকের স্থবিরতা ভেঙে নিরাপত্তা পরিষদ নতুন শক্তি নিয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নতুন এই পাঁচ দেশের সদস্যপদ লাভের পর সেই বিতর্ক আবারও নতুন করে শুরু হয়েছে। নির্বাচিত নতুন দেশগুলো যদি তাদের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক সংকটের সমাধান করতে পারে, তবেই এই নির্বাচনের প্রকৃত সার্থকতা প্রমাণিত হবে।
আমরা আশা করি, নতুন সদস্য হিসেবে অস্ট্রিয়া, কিরগিজস্তান, পর্তুগাল, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং জিম্বাবুয়ে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করছে, তা তারা যথাযথভাবে পালন করবে। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা, নিরাপত্তা পরিষদ এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেবে যা কেবল শক্তিশালী দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং যুদ্ধবিগ্রহের কবল থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আগামী দুই বছরের এই পথচলা বিশ্ব ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে, যেখানে বাংলাদেশও সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এই নতুন অভিযাত্রায় বিশ্বের সকল দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।