প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নতুন বছরের শুরুতেই দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন সাধারণ মানুষ। সরকার এক লাফে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করায় জনজীবনে নতুন করে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিলেও, এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পারিবারিক বাজেটে। গত কয়েক মাসে দফায় দফায় জ্বালানি তেল, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে মানুষ এমনিতেই নাবিশ্বাস অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তার ওপর বিদ্যুতের এই নতুন মূল্যবৃদ্ধি যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসার চালানোর কঠিন বাস্তবতায় হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষ এখন নতুন করে হিসাব মেলাতে শুরু করেছেন যে, মাস শেষে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাল্লা কতটা ভারি হতে যাচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী মাহবুবুল হাসানের সঙ্গে। তার চোখে-মুখে ছিল অনিশ্চয়তার ছাপ। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, প্রতিদিন সকালে যখন বাজারে যাই, তখন প্রতিটি পণ্যের গায়ে নতুন দামের ছোঁয়া পাই। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ার খবর শুনলাম। আমার বাড়িতে মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল আসে, এখন থেকে তার চেয়ে অন্তত তিন-চারশ টাকা বেশি গুনতে হবে। কিন্তু আমার মাসিক বেতন তো বাড়ছে না। এই বাড়তি খরচের জোগান দিতে গিয়ে আমাকে হয়তো অন্য কোনো মৌলিক প্রয়োজন বিসর্জন দিতে হবে। মানুষের এই আর্তনাদ কেবল মাহবুবুল হাসানের একার নয়, এটি আজ প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তব চিত্র। ব্যবসায়ীরাও এই সুযোগে বাজারের প্রতিটি পণ্যের দাম আরেক দফা বাড়িয়ে দেওয়ার পায়তারা করছে বলে মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কেবল পারিবারিক বাজেটে আঘাত হানছে না, বরং সাধারণ মানুষের স্বপ্নের পথেও বাধার সৃষ্টি করছে। তেজতুরী বাজারে কথা হলো শাহ আলমের সঙ্গে। তীব্র দাবদাহে যখন মানুষ অস্থির, তখন একটি এসির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন তিনি। কিন্তু বিদ্যুতের দাম বাড়ার ঘোষণার পর তিনি সেই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছেন। শাহ আলমের মতো অসংখ্য মানুষ এখন ফ্যানের সুইচ চাপার আগেও হিসাব করছেন। এই মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রার মানকে কেবল নিচে নামিয়ে দিচ্ছে না, বরং নাগরিক সুবিধা থেকে মানুষকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ আধুনিক সভ্যতায় বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার মৌলিক প্রয়োজন।
কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান এই পরিস্থিতির পেছনে সুশাসনের অভাবকে দায়ী করছেন। তিনি মনে করেন, ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার যুক্তিটি সরকার বারবার ব্যবহার করছে, কিন্তু দেশের ভেতরে যে লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা রয়েছে, তা বন্ধে কোনো জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। জ্বালানি তেল, এলপিজি সিলিন্ডার এবং এখন বিদ্যুৎ—প্রতিটি ক্ষেত্রে ভর্তুকি কমানোর নামে যেভাবে মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, সেবার মান না বাড়িয়ে এবং খাতের চুরি-চাঁদাবাজি বন্ধ না করে বারবার সাধারণ মানুষের পকেট কাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শিল্প খাতের অবস্থাও এখন অত্যন্ত নাজুক। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) জানিয়েছে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময় থেকে দেশের শিল্প খাত একের পর এক ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন এবং নির্মাণ খাতের মন্দা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এর ওপর গত কয়েক বছরে বিদ্যুতের ট্যারিফ প্রায় ৩৬ শতাংশ, ডিমান্ড চার্জ ১২৫ শতাংশ এবং গ্যাসের মূল্য ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এখনকার ১৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে যেখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। শিল্প মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলেও দেশের বিদ্যুৎ ট্যারিফে তার কোনো প্রতিফলন নেই, যা একমুখী মূল্যনীতির পরিচয় দেয়।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানের ওপর। শিল্প স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। বিএসএমএ এবং অন্যান্য শিল্প সংগঠনের প্রতিনিধিরা সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন যে, এই নতুন মূল্যবৃদ্ধি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক। অন্যথায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে বড় ধরনের বেকারত্ব সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হবে। শিল্পের আর্থিক ভিত্তিকে টিকিয়ে রাখতে না পারলে জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা পুনঃমূল্যায়ন করা। লুটপাট ও অপচয় বন্ধ করে কীভাবে উৎপাদন ব্যয় কমানো যায়, সেদিকে মনোনিবেশ করতে হবে। সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে উন্নয়ন নিশ্চিত করা টেকসই হতে পারে না। মানুষ চায় স্বস্তি, মানুষ চায় ন্যায্য মূল্য। বিদ্যুতের এই নতুন ট্যারিফ কাঠামো প্রত্যাহার করে শিল্প ও জনজীবনকে সুরক্ষা প্রদান করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। নতুবা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হতে থাকবে, যার পরিণতি হবে সামাজিক অস্থিরতা।
এখন সময় হয়েছে সরকারি পর্যায়ে স্বচ্ছতা আনার। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের প্রতিটি ক্রয়ের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে উৎপাদন খরচ পর্যন্ত যদি সঠিক অডিট করা হয়, তবেই বোঝা যাবে এই মূল্যবৃদ্ধির আসল কারণ কী। সাধারণ মানুষ আর কত দিন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দায় বহন করবে? রাষ্ট্র যখন উন্নয়নের কথা বলে, তখন সেই উন্নয়নের সুফল সবার আগে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছানো প্রয়োজন। আশা করা যাচ্ছে, সরকার জনমতের গুরুত্ব বিবেচনা করে বিদ্যুতের এই নতুন মূল্যবৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করবে এবং শিল্প ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবে।