৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণ: ফুচকা ব্যবসায়ীর গণপিটুনি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ৮ বার
৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণ: ফুচকা ব্যবসায়ীর গণপিটুনি

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আমাদের সমাজে যখনই কোনো শিশুকন্যার ওপর পাশবিক নির্যাতনের সংবাদ আসে, তখন তা কেবল একটি আইনি প্রতিবেদন নয়, বরং গোটা জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। নাটোর সদর উপজেলায় ৫ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে ফুচকা খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের যে জঘন্য ঘটনা ঘটেছে, তা মানবিকতার চরম অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে। শরিফুল ইসলাম নামে এক ফুচকা ব্যবসায়ীর দ্বারা সংঘটিত এই নির্মম অপরাধ নাটোরের সাধারণ মানুষকে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। যে ব্যক্তি পথে-ঘাটে মানুষের খাবার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তিনিই যখন একটি শিশুর শৈশব ও ভবিষ্যতের ওপর এমন কলঙ্কজনক থাবা দেন, তখন তা সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামোকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

মঙ্গলবার বিকেলের সেই ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং নিষ্ঠুর। স্থানীয় সূত্রের তথ্যানুযায়ী, শরিফুল ইসলাম ওই শিশুকে ফুচকা খাওয়ানোর নাম করে ভুট্টাখেতে নিয়ে যায়। নির্জনতার সুযোগ নিয়ে সে শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। শিশুটির আর্তনাদ এবং কান্নার চেয়েও বড় আতঙ্ক ছিল অপরাধীর সেই ভয়াবহ হুমকি—ঘটনাটি কাউকে বললে সে শিশুটিকে হত্যা করবে। একজন ৫ বছরের শিশু, যার পৃথিবীটা গড়ে ওঠে আদর আর ভালোবাসার বলয়ে, সে এই নৃশংসতার অর্থ বোঝার আগেই এক ভয়াবহ ট্রমার শিকার হয়েছে। শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত নাটোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শরীরের ক্ষত হয়তো এক সময় শুকিয়ে যাবে, কিন্তু মনের ভেতর যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা সারিয়ে তোলা হবে এক দীর্ঘ লড়াই।

ঘটনাটি বুধবার সন্ধ্যায় জানাজানি হওয়ার সাথে সাথেই স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। শরিফুল ইসলামকে খুঁজে বের করে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে গণপিটুনি দেয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের ভেতরে জমে থাকা অপরাধীদের প্রতি চূড়ান্ত ঘৃণার প্রতিধ্বনি। যদিও আইনের শাসন অনুযায়ী গণপিটুনি কোনো বৈধ সমাধান হতে পারে না, তবুও এ ধরনের জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই বুঝিয়ে দেয়, তারা আর কতদিন এই অবক্ষয় নীরবে সহ্য করবে। স্থানীয়রা তাকে গণপিটুনি দেওয়ার পর পুলিশে সোপর্দ করে এবং এরপরই নাটোর সদর থানায় শিশুটির মা বাদী হয়ে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন।

নাটোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর রহমান জানিয়েছেন যে, পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত শরিফুলকে আটক করে এবং তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং লঘু সাজার ভয়ে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। সাধারণ মানুষের দাবি, এই মামলাটি যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মাধ্যমে অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। এমন অপরাধীর যেন সমাজ থেকে চিরতরে নির্মূল হওয়ার নজির তৈরি হয়।

শিশুর বিরুদ্ধে এই ধরনের যৌন নির্যাতন আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতির এক অন্ধকার দিক তুলে ধরে। প্রতিটি পাড়ায়, মহল্লায় এবং গ্রামে শিশুরা এখন কতটা অনিরাপদ, এই ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। অভিভাবক হিসেবে আমাদের সচেতনতা কি যথেষ্ট? এমন ঘটনার পর থেকে নাটোরের সচেতন মহল অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে পরিচিত মুখ বা পেশাদার ফেরিওয়ালাদের প্রলোভন থেকে শিশুদের দূরে রাখার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের দায়িত্ব কেবল অভিভাবকদের সচেতন করা নয়, বরং এমন একটি কঠোর আইন ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা, যাতে কেউ কোনো শিশুর গায়ে হাত দেওয়ার সাহস না পায়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটির শারীরিক অবস্থা এখন কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, তার মানসিক আঘাতের বিষয়টি বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন। এই লড়াই কেবল শারীরিক সুস্থতার নয়, বরং শিশুটিকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার। এমন পরিস্থিতিতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। শুধু আইনি লড়াই নয়, বরং শিশুটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তার পরিবারের প্রতি মানসিক সমর্থন জানানো আমাদের সকলের দায়িত্ব। নাটোরের এই ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধের সংবাদ নয়, এটি প্রতিটি বাবা-মায়ের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

আমরা আশা করব, তদন্তকারী সংস্থা এই ঘটনার প্রতিটি আলামত সঠিকভাবে সংগ্রহ করবে যাতে আদালতের কাছে অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ফাঁকফোকর না থাকে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে এই মামলাটি পরিচালনা করেন। অভিযুক্ত শরিফুল ইসলামের মতো অপরাধীদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তাদের কঠোর সাজার আওতায় নিয়ে আসাই এখন একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। সমাজে যদি অপরাধীদের এমন দ্রুত সাজা কার্যকর করা যায়, তবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ ফিরে আসবে।

পরিশেষে বলা যায়, শিশু আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের এবং সমাজের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। শরিফুলের মতো লম্পটদের দ্বারা যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। কিন্তু বিচারের মাধ্যমে যদি তাদের উচিত শিক্ষা দেওয়া যায়, তবেই হয়তো রামিসার মতো বা নাটোরের এই শিশুটির মতো আর কোনো শিশুকে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না। বিচারপ্রার্থী পরিবারটি এখন কেবল আদালতের রায়ের অপেক্ষায়। তারা চায় তাদের সন্তানের ওপর ঘটে যাওয়া এই অত্যাচারের যেন সঠিক বিচার হয়। রাষ্ট্র যদি এই ঘটনায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তবেই সমাজ কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত