প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে তিনি তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। প্রায় ২১ মাস দায়িত্ব পালনের পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার এই আকস্মিক পদত্যাগের বিষয়টি বিএসইসি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। পুঁজিবাজারের অস্থিরতার এই সময়ে তার দায়িত্ব ছাড়ার খবর বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘ ২১ মাসের দায়িত্ব পালনকালে রাশেদ মাকসুদ পুঁজিবাজারের সংস্কার এবং শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, যখন তিনি ও তার দল কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তখন পুঁজিবাজার ছিল এক চরম অস্থিরতার মধ্যে। বাজারকে একটি স্থিতিশীল কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে তারা শুরু থেকেই আইনি কাঠামো পুনর্গঠন ও বাজার শৃঙ্খলার দিকে বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। তার এই মেয়াদকালে কমিশনের মাধ্যমে প্রায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে মার্জিন, আইপিও, মিউচুয়াল ফান্ড এবং ঋণপত্র সংক্রান্ত বিধিমালা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন করে তিনি পুঁজিবাজারে সুশাসনের ভিত্তি মজবুত করার চেষ্টা করেছিলেন।
রাশেদ মাকসুদ কেবল বর্তমান বিধিমালা নিয়েই কাজ করেননি, বরং ভবিষ্যতে বাজারকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে করপোরেট গভর্ন্যান্স, অডিট এবং করপোরেট পুনর্গঠনের মতো জটিল বিষয়গুলোতে তিনটি খসড়া বিধিমালা জনমত গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। তার মেয়াদের সবচেয়ে বড় আইনি অর্জন হিসেবে ধরা হচ্ছে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন’ এবং ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন’-এর খসড়া প্রস্তুত করা, যা ইতোমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই আইনগুলো কার্যকর হলে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে বলে বিশেষজ্ঞ মহলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাশেদ মাকসুদ কমপ্লায়েন্স ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বাজারে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আইনের শাসন ছাড়া বাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও ইস্যুয়াররা স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তার এই কঠোর মনোভাব বাজারের দুষ্টচক্র ভাঙার ক্ষেত্রে এক সময় সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল। তার মতে, বিনিয়োগকারী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ছিল কমিশনের অন্য একটি বড় অর্জন।
পদত্যাগের ঘোষণায় তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গত ২১ মাসে তারা একটি উদ্যামী ও দক্ষ দল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, যারা ভবিষ্যতে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। তার এই পদত্যাগ পুঁজিবাজারের কোনো বড় সংকটের ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ধোঁয়াশা থাকলেও তিনি ব্যক্তিগত কারণকেই বড় করে দেখিয়েছেন। তবে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা যখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে, তখন চেয়ারম্যানের এই প্রস্থান বাজারের বিনিয়োগকারীদের মনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজার সংস্কারের কাজ সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জিং এবং সময়সাপেক্ষ বিষয়। রাশেদ মাকসুদ যে ভিত্তিগুলো তৈরি করে গেছেন, তা যদি পরবর্তী নেতৃত্ব সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে পারে, তবেই বাজার তার সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাবে। বর্তমানের এই সংকটকালীন সময়ে কমিশনের পরবর্তী চেয়ারম্যানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজারের হারানো আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা। বিশেষ করে আইপিও প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেনের তারল্য সংকট কাটানোর বিষয়টি এখন সময়ের দাবি।
রাশেদ মাকসুদের বিদায় বেলাতেও তিনি পুঁজিবাজারের ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, তার তৈরি করা আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করে তুলবে। তিনি নিজে ব্যক্তিগত কাজে মনোনিবেশ করার কথা বললেও, আর্থিক খাতের পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, তাকে হয়তো আরও বড় কোনো দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে অথবা তিনি স্বেচ্ছায় নিজের সময়ের ইতি টেনেছেন। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে বিএসইসি কোন পথে এগোয় এবং নতুন চেয়ারম্যান বাজারের দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যাগুলো কত দ্রুত মোকাবিলা করতে পারেন।
পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো পুঁজিবাজার। খন্দকার রাশেদ মাকসুদ সেই বাজারের হাল ধরেছিলেন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে। তার ২১ মাসের পথচলায় অনেক প্রাপ্তি এবং কিছু অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে। কিন্তু একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তিনি যে সংস্কারের সূচনা করেছিলেন, তা যেন অপচয় না হয়—সেই প্রত্যাশা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার যে লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, তা কেবল একজন চেয়ারম্যানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। একটি পরিচ্ছন্ন পুঁজিবাজার গঠনে সরকারের সদিচ্ছা এবং কমিশনের নিষ্ঠাই এখন একমাত্র পথ। বিনিয়োগকারীরা কেবল একটি নিরাপদ এবং কারসাজিমুক্ত বাজার চায়, যেখানে তারা তাদের কষ্টের সঞ্চয় বিনিয়োগ করে ভরসা পাবে।