মোংলা বাজারে ভয়াবহ আগুন: পুড়ে ছাই ৫ সহস্রাধিক মুরগি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ৬ বার
মোংলা বাজারে ভয়াবহ আগুন: পুড়ে ছাই ৫ সহস্রাধিক মুরগি

প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মাছ বাজারে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন ও শ্রমকে মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। বুধবার রাত পৌনে ১টার দিকে শুরু হওয়া এই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত পাঁচটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত হয়েছে। আগুনে সহস্রাধিক মুরগি, ব্যবসায়ীদের সারা দিনের জমানো নগদ অর্থ এবং প্রয়োজনীয় মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসছিল ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ। একটি সমৃদ্ধ বাজারের একাংশ চোখের নিমিষেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় পুরো এলাকায় এখন শোকের ছায়া বিরাজ করছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, গভীর রাতে যখন বাজারের ব্যস্ততা শেষ হয়ে মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই মাছ বাজার এলাকার একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুনের শিখা ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং প্রবল বেগে পাশের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, স্থানীয়রা এগিয়ে এসেও প্রাথমিক পর্যায়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। মোংলা ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রায় এক ঘণ্টার প্রাণান্তকর লড়াইয়ের পর রাত পৌনে ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। যদি ফায়ার সার্ভিস আরও কিছুটা বিলম্ব করত, তবে বাজারের বাকি অংশে আগুন ছড়িয়ে পুরো এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আহাজারিতে মোংলা বাজারের বাতাস আজ ভারী হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাজারে থাকা দুটি পাইকারি মুরগির আড়ত ছিল আগুনের প্রধান শিকার। সেখানে রাখা ৫ সহস্রাধিক মুরগি আগুনে পুড়ে মারা যায়। একই সঙ্গে পাশেই থাকা তিনটি মাছের আড়তও সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে আড়তের ভেতরে থাকা নগদ টাকা, জরুরি নথিপত্র, মাছ বিক্রির আধুনিক সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্র রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন যে, তাদের প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পুঁজি হারিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

মোংলা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে জানিয়েছেন যে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। বাজারের পুরনো বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবকে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখছেন ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা। তিনি আরও জানান যে, বাজারের ঘনবসতিপূর্ণ দোকান এবং সরু গলির কারণে আগুন নেভাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ উদঘাটন এবং ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত নিরূপণের জন্য একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। সঠিক তদন্তের পরই জানা যাবে এই ভয়াবহতার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না।

ব্যবসায়ীরা এখন সরকারের কাছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তাদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। একটি পরিবারের জীবনযাত্রা যেখানে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এক রাতের অগ্নিকাণ্ড তাদের বছরের জমানো স্বপ্নগুলোকে ছাইয়ে পরিণত করে দিয়েছে। মোংলা বাজারের অনেক ব্যবসায়ী বছরের পর বছর ধরে তিলে তিলে তাদের ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন। এখন নিঃস্ব হওয়ার পর তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সরকারি সহায়তা এবং ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সহজতর উপায় ছাড়া তাদের পক্ষে পুনরায় ব্যবসা শুরু করা প্রায় অসম্ভব। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে তাদের পরিবারের সদস্যরা চরম মানবেতর জীবনযাপন করবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে মোংলা বাজারের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বাজারে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের অভাব এবং পানির উৎসের সীমাবদ্ধতা বারবার অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডে হাজার হাজার প্রাণ ও সম্পদ নষ্ট হলেও, আমাদের বাজারগুলোর অবকাঠামোতে কেন নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা রাখা হয় না—সেই প্রশ্ন আজ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। ঘনবসতিপূর্ণ বাজারে বৈদ্যুতিক সংযোগের সঠিক তদারকি করা এবং প্রতিটি মার্কেটে ফায়ার হাইড্র্যান্ট বা অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

এই মানবিক বিপর্যয়ে মোংলা বাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা এখন কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের আশা, স্থানীয় প্রশাসন তাদের এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াবে। এই অগ্নিকাণ্ড কেবল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নষ্ট করেনি, বরং অনেক মানুষের রুটি-রুজির পথ বন্ধ করে দিয়েছে। একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন বাজার ব্যবস্থা এবং অগ্নিনির্বাপক সচেতনতা যদি আগে থেকেই থাকত, তবে হয়তো এত বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো। ভবিষ্যতে যেন এমন অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য এখন থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন বাজারের সকল ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী।

মোংলা বাজারের এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। আমাদের প্রতিটি শহর ও গ্রামের প্রতিটি বাজারে জরুরি ভিত্তিতে বৈদ্যুতিক সিস্টেম পরীক্ষা এবং অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া চালু রাখা প্রয়োজন। একটি অগ্নিকাণ্ড কেবল মালামাল ধ্বংস করে না, তা ধ্বংস করে দেয় অনেক মানুষের বাঁচার স্বপ্ন। মোংলা বাজারে আজ যে ধ্বংসস্তূপ পড়ে আছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অসাবধানতা ও পরিকল্পনার অভাব কত বড় মাশুল দাবি করতে পারে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে পুনরায় আলোর মুখ দেখার অপেক্ষায় এখন ওই পাঁচ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী। তাদের এই হারানো স্বপ্ন ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত