বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামে পানির বোতল নিষিদ্ধ করল ফিফা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ৭ বার
বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামে পানির বোতল নিষিদ্ধ করল ফিফা

প্রকাশ: ৪ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মহোৎসব, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উত্তাপ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো পৃথিবীতে। তবে টুর্নামেন্টটি শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে দর্শকরা এক বড় দুঃসংবাদের মুখোমুখি হয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা তাদের স্টেডিয়াম আচরণবিধিতে এমন এক পরিবর্তন এনেছে, যা বিশ্বজুড়ে ক্রীড়াপ্রেমী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছে। এখন থেকে বিশ্বকাপের কোনো স্টেডিয়ামেই দর্শকরা তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পুনঃব্যবহারযোগ্য বা রিইউজেবল পানির বোতল নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে ফিফার নেওয়া এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত ফুটবলপ্রেমীদের সাধারণ অধিকারের ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

দীর্ঘদিন ধরে ফিফার স্টেডিয়াম আচরণবিধিতে দর্শকরা এক লিটার পর্যন্ত ধারণক্ষমতার খালি ও স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে প্রবেশের সুযোগ পেতেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ রক্ষা এবং সাধারণ দর্শকদের কষ্ট লাঘব করা। স্টেডিয়ামের ভেতরে থাকা পানির ফোয়ারা বা রিফিল স্টেশনগুলো থেকে দর্শক তাদের বোতল পূর্ণ করে তৃষ্ণা মেটাতে পারতেন। তবে গত মঙ্গলবার (২ জুন) ফিফা তাদের সেই দীর্ঘদিনের নমনীয় নীতি বাতিল করে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ধরনের রিইউজেবল বোতল স্টেডিয়ামের ফটক দিয়ে ভেতরে নেওয়া যাবে না। ফিফা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, নিরাপত্তার স্বার্থেই তারা এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে সাধারণ দর্শকদের কাছে এই দাবি একপেশে এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হচ্ছে।

বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে লাখ লাখ দর্শক মাঠে আসেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে খেলা চলাকালীন পানির চাহিদা মেটানো প্রতিটি মানুষের জন্য অপরিহার্য। নিজের পানির বোতল সঙ্গে থাকলে মানুষ যখন ইচ্ছে তৃষ্ণা মেটাতে পারেন, কিন্তু এখন সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে স্টেডিয়ামের ভেতরে থাকা একমাত্র পানির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে অনুমোদিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পানীয়। সমালোচকরা মনে করছেন, ফিফা আসলে তাদের বাণিজ্যিক পার্টনারদের স্বার্থ রক্ষায় এই নীতি গ্রহণ করেছে। কারণ, স্টেডিয়ামের ভেতরে বাইরের বোতল নিষিদ্ধ করার ফলে দর্শকরা বাধ্য হয়ে উচ্চ মূল্যে পানি বা পানীয় ক্রয় করতে বাধ্য হবেন।

গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপে এমন একটি অভিজ্ঞতার কথা এখনও দর্শকদের স্মৃতিতে টাটকা। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে স্টেডিয়ামের ভেতরে এক বোতল পানির দাম চাওয়া হয়েছিল ৪ থেকে ৬ ডলার পর্যন্ত, যা সাধারণ দর্শকদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে ছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপে পানির দাম কত হবে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা না হলেও, ফিফার দীর্ঘদিনের পার্টনার কোকা-কোলার ব্র্যান্ড ‘দাসানি’ স্টেডিয়ামগুলোতে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দর্শকরা যখন নিজের বোতল ব্যবহারের স্বাধীনতা হারাবেন, তখন তারা ক্রীড়া পণ্যের বাজারে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়বেন। এটি কেবল অর্থনৈতিক চাপ নয়, বরং দীর্ঘক্ষণ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে পানি কেনার বিড়ম্বনার ঝুঁকিও বাড়াবে।

ফিফার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ফুটবল সমর্থকরা বলছেন, এটি ‘ফুটবল ফর অল’ বা সবার জন্য ফুটবল—এই দর্শনের সরাসরি পরিপন্থী। পরিবেশ সচেতন দর্শকরাও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন। কারণ, হাজার হাজার দর্শক যদি স্টেডিয়ামের ভেতর থেকে প্লাস্টিকের বোতল বা ওয়ান-টাইম কাপে পানি পান করেন, তবে স্টেডিয়ামের ভেতরে বর্জ্য বা প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যাবে। অথচ রিইউজেবল বোতল ব্যবহার করলে প্লাস্টিকের ব্যবহার বহুলাংশে কমানো যেত। জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে ফিফার মতো একটি প্রভাবশালী সংস্থা যখন পরিবেশ রক্ষার পরিবর্তে ব্যবসায়িক মুনাফাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তা বিশ্ববাসীর জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।

বিশ্বকাপ আয়োজনকারী দেশগুলোর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে কারোরই দ্বিমত নেই। কিন্তু নিরাপত্তা আর সাধারণ দর্শকদের মানবিক চাহিদার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। একটি স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বোতল কীভাবে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে। ফিফা যদি সত্যিই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তবে তারা বোতল স্ক্যান করার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তা না করে সরাসরি বোতল নিষিদ্ধ করাটা একটি চরমপন্থা ছাড়া আর কিছুই নয়। ফুটবল ম্যাচ দেখার আনন্দ এখন চরম গরমের মধ্যে তৃষ্ণার্ত থাকার বিড়ম্বনায় রূপ নিতে পারে।

মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, স্টেডিয়ামে আসা শিশুদের, বৃদ্ধদের ও শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের নিয়মিত পানির প্রয়োজন হয়। নিজের বোতল সঙ্গে না থাকলে তারা বারবার কনসেশনে ভিড় করতে পারবেন না। ফিফার এই নিয়ম পরিবর্তনের ফলে স্টেডিয়ামের ভেতরে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণার্ত থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা আশা করব, ফিফা কর্তৃপক্ষ তাদের এই সিদ্ধান্তে আবারও পরিবর্তন আনবে বা এমন কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করবে যাতে দর্শকরা পানির সংকটে না পড়েন। সমর্থকদের সন্তুষ্টি ছাড়া ফুটবলের জনপ্রিয়তা বজায় রাখা অসম্ভব।

ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি আবেগ। সেই আবেগের উৎস যাদের থেকে আসে, সেই সমর্থকদের প্রতি ফিফার এমন কঠোর আচরণ মোটেও শোভনীয় নয়। স্টেডিয়ামের ভেতরে বিনামূল্যে পানির ব্যবস্থা রাখা কিংবা পানির বোতলের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এখন সময়ের দাবি। কোটি কোটি দর্শক যারা বিশ্বকাপকে সফল করার জন্য মাঠে আসেন, তাদের ন্যূনতম চাহিদার প্রতি সম্মান জানানো ফিফার দায়িত্ব। আশা করা যায়, আগামী দিনগুলোতে ফিফা আরও নমনীয় ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে এবং ফুটবলপ্রেমীদের মনের আশা পূরণ করবে। বিশ্বকাপের আসল আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন দর্শকরা কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা ছাড়া মাঠের লড়াই উপভোগ করতে পারবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত