ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আম: নিয়ম মেনে চললে কি ভয়ের কিছু আছে?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ৮ বার
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আম: নিয়ম মেনে চললে কি ভয়ের কিছু আছে?

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গ্রীষ্মকাল মানেই ফলের রাজা আমের সমাহার। চারিদিকে রসালো ও সুমিষ্ট আমের মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। আম পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু যাঁদের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী মরণব্যাধি ডায়াবেটিস বাসা বেঁধেছে, তাঁদের জন্য আমের মৌসুমটি হয়ে ওঠে এক পরম ধৈর্যের পরীক্ষা। চোখের সামনে প্রিয় এই ফল দেখেও যেন খাওয়ার উপায় নেই—এমন আক্ষেপ অনেকেরই দীর্ঘদিনের। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান কী বলছে? সত্যিই কি ডায়াবেটিস রোগীরা আম ছুঁতেও পারবেন না? সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ম মেনে ও সচেতনতার সঙ্গে আম খেলে তা স্বাস্থ্যের বড় কোনো ক্ষতি করে না। তবুও এই বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ভীতি ও কৌতূহল কাজ করে।

ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা বা গ্লুকোজের ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই জরুরি। যেহেতু আমে প্রাকৃতিক চিনি বা ফ্রুক্টোজের পরিমাণ প্রচুর, তাই চিকিৎসকরা সব সময় ডায়াবেটিস রোগীদের আম খাওয়ার ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে, আম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ কোনো ফল নয়। বরং সঠিক নিয়ম ও পরিমাণ মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীরাও গ্রীষ্মের এই উপহারটি উপভোগ করতে পারেন। ভারতীয় গণমাধ্যম ‘আজকাল’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন ডায়াবেটিস রোগী দিনে একটির বেশি আম না খাওয়াই শ্রেয়। এর চেয়ে বেশি আম খেলে তা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

আম খাওয়ার সময় একটি সাধারণ ভুল আমরা সবাই করে থাকি, তা হলো ভারী খাবারের সঙ্গে আম খাওয়া। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর। দুপুরের বা রাতের ভরা পেটে ভাতের সঙ্গে বা খাবারের ঠিক পরপরই আম খেলে তা রক্তে ইনসুলিনের মাত্রাকে অস্বাভাবিকভাবে প্রভাবিত করে। পুষ্টিবিদদের মতে, সকালের নাশতা এবং দুপুরের খাবারের মাঝামাঝি সময়টি আম খাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এই সময় শরীরে শক্তির প্রয়োজন থাকে এবং আম থেকে প্রাপ্ত ক্যালোরি শরীরের স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়ায় সহজেই ব্যবহৃত হতে পারে। খালি পেটে আম না খাওয়াই ভালো, এতে শর্করার শোষণ দ্রুত হয়।

আম খাওয়ার পদ্ধতিতেও আনতে হবে কিছুটা পরিবর্তন। অনেকে আমের রসের প্রতি আসক্ত, যা সরাসরি রক্তে চিনি বাড়িয়ে দেয়। ডায়াবেটিস রোগীদের উচিত আমের জুস, আমের পুডিং, আমসত্ত্ব বা মিষ্টি কোনো ডেজার্ট থেকে শত হাত দূরে থাকা। এই প্রক্রিয়াজাত আমে চিনির ঘনত্ব থাকে আকাশচুম্বী। পরিবর্তে, তারা আস্ত আম চিবিয়ে খেতে পারেন। আমের আঁশ বা ফাইবার রক্তে শর্করার শোষণ ধীর করতে সাহায্য করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী। আমের পুষ্টিগুণ বৃদ্ধির জন্য এর সঙ্গে কিছু প্রোটিন বা ভালো চর্বিযুক্ত খাবার মিশিয়ে নিতে পারেন। যেমন, আমের টুকরোর সাথে সামান্য বাদাম, স্প্রাউট বা শসা যোগ করলে রক্তে চিনির মাত্রা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ পায় না।

রাতের বেলা আম খাওয়ার অভ্যাস ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। রাতের খাবার খাওয়ার পর আমাদের শারীরিক পরিশ্রমের হার কমে আসে, ফলে শর্করা সরাসরি চর্বি হিসেবে জমা হওয়ার প্রবণতা দেখায়। রাতের তালিকায় পাকা আম রাখা থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া আমের মিষ্টিতা এবং ক্যালোরির কথা মাথায় রেখে দিনের অন্য কোনো মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার বাদ দেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। যদি দিনে একটি আম খাওয়া হয়, তবে ওইদিন অন্য কোনো ফলের জুস বা মিষ্টি জাতীয় খাবার সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলাই ভালো। শরীরকে সুস্থ রাখতে গেলে এইটুকু ত্যাগ স্বীকার করা জরুরি।

ডায়াবেটিস রোগীদের ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আমের পরিমাণের তারতম্য হতে পারে। যাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেওয়া অনুচিত। কোনো ফল বা খাবার খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের বা একজন নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। কারণ, প্রতিটি মানুষের শরীরের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা বিপাক ক্ষমতা ভিন্ন। যা একজনের ক্ষেত্রে কার্যকর, তা হয়তো অন্যজনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই নিজের শরীরের সংকেত বোঝা এবং সে অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নিয়ন্ত্রণ করাই হলো প্রকৃত সুস্থতার চাবিকাঠি।

পরিশেষে বলা যায়, ডায়াবেটিস কোনো রোগ নয়, এটি একটি জীবনধারা। এই জীবনধারা মেনে চললে পছন্দের খাবার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না। আম খাওয়ার ক্ষেত্রে সচেতনতা, পরিমিতিবোধ ও সঠিক সময়ের নির্বাচনই পারে ডায়াবেটিস রোগীদের এই গ্রীষ্মকালীন আনন্দ থেকে মুক্তি দিতে। প্রিয় এই ফলটি খাওয়ার আনন্দ উপভোগ করুন, কিন্তু সচেতনতার চশমাটি খুলবেন না। আম হোক স্বাস্থ্যের জন্য আশীর্বাদ, ভয়ের কারণ নয়। আপনার সামান্য সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রিত জীবনই পারে আপনাকে সুস্থ রাখতে এবং প্রিয় ফলটি উপভোগের সুযোগ করে দিতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত