প্রকাশ: ৮ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যশোরের শান্তিপ্রিয় জনপদ শেখহাটি তামালতলা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একটি দাম্পত্য সম্পর্কের করুণ পরিণতি কেবল একটি পরিবারকেই ধ্বংস করেনি, বরং গোটা সমাজকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে মাদকের ভয়াল থাবা নিয়ে। সোমবার ভোরবেলায় যখন প্রকৃতি যখন জেগে উঠছিল, ঠিক তখনই ঘটে গেল এক নৃশংস ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। নেশার টাকার জেদ আর পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রী ছামিনা আক্তারকে ধারালো ছুরি দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন তার স্বামী সুজন। ঘটনার আকস্মিকতা এবং নির্মমতায় এলাকাবাসী স্তব্ধ। স্ত্রীকে হত্যার পরপরই ঘাতক স্বামী সুজন একই অস্ত্র দিয়ে নিজের শরীরে আঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, যা এই ঘটনার ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নিহত ছামিনা আক্তার ও অভিযুক্ত সুজন শেখহাটি তামালতলা এলাকার ইমরাজের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। সুজন টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার গয়হাটা গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে। সাংসারিক জীবনের টানাপোড়েন আর মাদকের নেশা তাদের সুন্দর স্বপ্নগুলোকে যেভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, তা যেন বর্তমান সময়ের অস্থির সামাজিক বাস্তবতারই এক প্রতিচ্ছবি। স্থানীয় ও নিহতের স্বজনদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সূত্রপাত হয় ভোরবেলা। নেশার টাকার চাহিদা থেকে শুরু হওয়া তর্কের মাত্রা ক্রমশই বাড়তে থাকে। সুজন দীর্ঘ দিন ধরেই মাদকাসক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। নেশার টাকা না মেলায় এক পর্যায়ে সুজন নিজেকে আর সামলাতে পারেননি। ক্ষিপ্ত সুজন ধারালো ছুরি বের করে স্ত্রী ছামিনার শরীরের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক আঘাত করতে থাকেন। নিস্তেজ শরীর নিয়ে ছামিনা মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে রক্তে ভিজে যায় ঘরের মেঝে।
চিৎকার ও আর্তনাদ শুনে স্থানীয় প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ছামিনা ও সুজনকে উদ্ধার করে দ্রুত যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা ছামিনা আক্তারকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মৃত ঘোষণা করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে, নিজের শরীরে ছুরি চালিয়ে গুরুতর আহত হওয়া সুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। হাসপাতালের বেডে থাকা সুজনের শারীরিক অবস্থা এখন কেমন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও তার এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে এলাকাজুড়ে চলছে তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার।
যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুম খান জানিয়েছেন, পুলিশ খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং হাসপাতালে মৃতদেহ সুরতহাল সম্পন্ন করেছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই ধরণের হত্যাকাণ্ডের পেছনে কি শুধু মাদকই দায়ী, নাকি আমাদের পারিবারিক বন্ধনের শৈথিল্যও এর পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
মাদকাসক্তি বর্তমান সময়ে দেশের অন্যতম বড় সামাজিক ব্যাধি। তরুণ ও যুবসমাজের একটি বড় অংশ আজ মাদকের মরণফাঁদে আটকা পড়ছে। নেশার টাকা জোগাতে তারা অসামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে আপনজনকে হত্যা করার মতো জঘন্য পথও বেছে নিচ্ছে। সুজনের মতো তরুণরা যখন নেশার ঘোরে আপন স্ত্রীর প্রাণ কেড়ে নিতে দ্বিধাবোধ করে না, তখন সমাজ কতটুকু নিরাপদ—সেই প্রশ্নটি আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ছামিনা আক্তারের অকাল মৃত্যু সেই সত্যকেই আবার সামনে নিয়ে এল যে, মাদকের ছোবল থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে না পারলে এ ধরনের ট্র্যাজেডি কোনোভাবেই থামানো সম্ভব নয়।
সমাজের নানা স্তরে মনোবিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে, মাদকের নেশা মানুষের বিচারবুদ্ধি ও মানবিক অনুভূতিকে বিলুপ্ত করে দেয়। সুজনের ক্ষেত্রেও সম্ভবত তা-ই ঘটেছে। নেশার টাকার জন্য যে আবেগীয় সংঘাত তৈরি হয়েছিল, তার কোনো যৌক্তিক সমাধান খুঁজতে সে ব্যর্থ হয়েছে। পরিবর্তে সে বেছে নিয়েছে সহিংসতার চরম পথ। সমাজ থেকে মাদক নির্মূলের জন্য রাষ্ট্রীয় কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতাও জরুরি। প্রতিটি পরিবারে যদি মাদক সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা এবং সন্তানদের ওপর নজরদারি বাড়ানো যায়, তবেই হয়তো ছামিনার মতো প্রাণ আর অকালে ঝরে পড়বে না।
আজকের এই ঘটনা যশোরবাসীর মনে গভীর দাগ কেটেছে। প্রতিবেশী ও স্বজনরা যারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন, তারা আজও সেই বিভীষিকাময় সকালের কথা ভেবে শিউরে উঠছেন। একটি সংসার ভাঙার পাশাপাশি দুটি জীবনের করুণ পরিণতি সমাজকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ কেবল আইনি নয়, বরং তা সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেও চালিয়ে যেতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের তদন্ত শেষ করবে এবং দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু যে প্রাণ ঝরে গেল, তা কি কোনো আইনি বিচারের মাধ্যমে ফিরে পাওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তরই আজ সবার কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।