প্রকাশ: ৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগামী ১১ জুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন মাইলফলক রচিত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট উত্থাপিত হবে জাতীয় সংসদে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিকেল তিনটায় দেশের ৫৫তম বাজেট পেশ করবেন, যা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আর রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির বাস্তবতার এক অনন্য মেলবন্ধন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটে আধুনিক, স্বচ্ছ এবং উন্নয়নমুখী এক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠবে, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, আসন্ন বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আয়কর কাঠামোতে আনা হচ্ছে আমূল পরিবর্তন। বাজেটের অন্যতম বড় চমক হতে যাচ্ছে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কর কাঠামো ঘোষণা। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম নিয়ে যখন সাধারণ মানুষ চিন্তিত, তখন সরকার প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার মাধ্যমে মধ্যবিত্তদের ওপর থেকে চাপ কমানোর চেষ্টা করছে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি প্রগতিশীল কর কাঠামো ঘোষণা করা হবে, যাতে করদাতারা আগে থেকেই তাদের করের হার অনুমান করতে পারেন। করমুক্ত আয়ের সীমার ক্ষেত্রে সাধারণ করদাতাদের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে তা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নারী, সিনিয়র সিটিজেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এবং প্রতিবন্ধী করদাতাদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ বাড়তি সুবিধা। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ সম্মাননা ও কর ছাড়ের ব্যবস্থা, যা সরকারের মানবিক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।
বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত এবং আকর্ষণীয় দিক হতে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের জন্য নেওয়া ‘মেগা ধামাকা’ সুবিধা। বিশ্বজুড়ে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন কনটেন্ট ক্রিয়েশনের যে বিপ্লব ঘটেছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের উৎসাহিত করতে সব প্রকার ফ্রিল্যান্সিং এবং সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েশন হতে অর্জিত আয়কে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার প্রস্তাব আসতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের লাখ লাখ তরুণ ঘরে বসেই তাদের মেধা ও শ্রমকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে। পাশাপাশি নতুন স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবসার ওপর টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাবনাটিও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ হয়ে আসবে। নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য এই সুবিধা আরও বাড়িয়ে টার্নওভারের সীমা ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বিশেষ নজর দিয়েছে। ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজসহ মোট ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে। একই সঙ্গে ভোজ্যতেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়াতে আগামী দশ বছরের জন্য শূন্য শতাংশ কর হারের ঐতিহাসিক প্রস্তাব করা হতে পারে। এই পদক্ষেপের ফলে কেবল বর্তমান বাজার পরিস্থিতিই শান্ত হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্প ও কৃষি খাতে এক অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার হবে।
বাজেটে স্বাস্থ্য খাত ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে অগ্রিম কর মওকুফ করার ফলে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। এছাড়া বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক ও চার্জিং স্টেশনের মতো পরিবেশবান্ধব পণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে আনা হচ্ছে। এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের অগ্রিম কর কমিয়ে আনা হচ্ছে, যা পরিবেশ সচেতন আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে সহায়তা করবে। দেশের আইটি ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে বিনিয়োগ করলে বিশেষ অবচয় সুবিধার ঘোষণাও থাকছে, যা ঢাকার ওপর চাপ কমিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
তবে কর ফাঁকির বিরুদ্ধে সরকার এবার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। যারা নিয়ম মেনে কর দেবেন, তাদের জন্য থাকছে সেরা করদাতা পুরস্কার নীতিমালা। পুরস্কারপ্রাপ্তরা বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ সুবিধা থেকে শুরু করে সরকারি হাসপাতালে কেবিনে অগ্রাধিকারসহ নানা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে সিগারেটের ফিল্টার ও নিকোটিন আমদানিতে তিনশ শতাংশের বেশি সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিলাসদ্রব্য ও বিদেশি প্রসাধনী আমদানির ওপর বাড়তি ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে একদিকে যেমন রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে দেশীয় পণ্যের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ তৈরি হবে।
সবশেষে বলা যায়, আসন্ন বাজেটটি কেবল গাণিতিক হিসাবের খাতা নয়, এটি একটি আগামীর রূপকল্প। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন এই বাজেট বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনীতির ভিত আরও মজবুত হবে। স্বচ্ছ কর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের যে নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে, তা বাংলাদেশেকে উন্নয়নের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তরুণ প্রজন্মের মেধা ও নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই বাজেট এক স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস যোগাবে। সাধারণ মানুষের স্বস্তি এবং টেকসই উন্নয়নের এই সমন্বিত পরিকল্পনা সফল হলে আগামী দিনে বাংলাদেশ এক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার পথে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাবে।