দীর্ঘ উত্তেজনা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আশার সঞ্চার করেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষ বসলেও বেশ কয়েকটি জটিল ইস্যু যেকোনো সময় এই সমঝোতা প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দিতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতাও বলছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক উন্নয়নের পথে বাধার সংখ্যা কম নয়।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর মতপার্থক্য
সমঝোতার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম কঠোরভাবে সীমিত করতে হবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
তেহরান মনে করে, পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নের অধিকার তাদের সার্বভৌম অধিকারের অংশ। ফলে এই ইস্যুতে কোনো পক্ষ ছাড় দিতে না চাইলে আলোচনা অচল হয়ে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ব্যাপক চাপে রয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন একসঙ্গে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে অনাগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান আগে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করুক। এই “আগে কে ছাড় দেবে” প্রশ্নটিই আলোচনার অন্যতম বড় জটিলতা।
পারস্পরিক অবিশ্বাস
চার দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে। বিভিন্ন সময়ে হওয়া সমঝোতা ও চুক্তি ভেঙে যাওয়ার কারণে উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়া যত সহজ, বাস্তবে বিশ্বাস পুনর্গঠন করা ততটাই কঠিন। অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে কোনো পক্ষই সহজে প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করতে চাইছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মনে করে, ইরানের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
অন্যদিকে ইরান দাবি করে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষার জন্যই এসব নীতি অনুসরণ করে। ফলে এই ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
শুধু আন্তর্জাতিক নয়, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও সমঝোতার পথে বড় বাধা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী রয়েছে যারা ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের ছাড়ভিত্তিক চুক্তির বিরোধিতা করে। একইভাবে ইরানেও এমন শক্তিশালী মহল রয়েছে যারা ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করতে রাজি নয়।
ফলে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
ইসরাইলের অবস্থান
ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তেল আবিব মনে করে, ইরানকে অতিরিক্ত কূটনৈতিক সুবিধা দেওয়া হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং তার কূটনৈতিক অবস্থানও আলোচনার গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে।
সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি
যেকোনো আকস্মিক সামরিক ঘটনা বা হামলা পুরো আলোচনাকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, একটি ড্রোন হামলা, সামরিক অভিযান বা আঞ্চলিক সংঘর্ষের কারণে কূটনৈতিক অগ্রগতি থমকে গেছে।
তাই আলোচনা চলাকালীন সময়েও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখা দুই পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে।
বন্দি বিনিময় ও মানবাধিকার ইস্যু
মানবাধিকার, বিদেশি নাগরিক আটক এবং বন্দি বিনিময় ইস্যুও আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। এসব বিষয়ে উভয় দেশের অবস্থান প্রায়ই মুখোমুখি অবস্থানে থাকে।
কোনো একটি ইস্যুতে অচলাবস্থা তৈরি হলে তা বৃহত্তর সমঝোতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সমঝোতা কি সম্ভব?
বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতার পথ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। উভয় পক্ষ যদি ধাপে ধাপে আস্থা তৈরির কৌশল গ্রহণ করে এবং বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়, তাহলে অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে।
তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাসের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া টেকসই কোনো চুক্তি অর্জন করা কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি তা ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিও কম নয়। আগামী দিনের আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষ কতটা নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করতে পারে এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনে কতটা আন্তরিক ভূমিকা পালন করে তার ওপর।